শুধু লাশ, শুধু কান্না

ঢাকার আর্মি স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে চিৎকার করে কাঁদছিলেন সেলিনা পারভীন ঝর্ণা; একজন পুলিশ কর্মকর্তা তাকে একটি ফরমে সই করতে অনুরোধ করছিলেন, কিন্তু তাতে রাজি হচ্ছিলেন না ষাটোর্ধ্ব এই নারী। সই করলেই যে তাকে নিজের ছেলে রকিবুল হাসানের লাশ বুঝে নিতে হবে!

সন্তানহারা এই মায়ের মত আরও অনেক স্বজনের আহাজারিতে সোমবার বিকালে ভারী হয়ে উঠছিল ঢাকার আর্মি স্টেডিয়ামের বাতাস।

ঢাকা আর্মি স্টেডিয়ামের পশ্চিম গ্যালারির সামনে সাদা শামিয়ানায় ছাওয়া মঞ্চটি সাজানো ছিল ‍ফুল দিয়ে। সারি বেঁধে তাতে সাজানো ছিল সারি সারি কফিন।

ঠিক এক সপ্তাহ আগে নেপালে ইউএস-বাংলার উড়োজাহাজ দুর্ঘটনায় নিহতদের মধ্যে ২৩ জনের মরদেহ দেশে আনার পর ওই স্টেডিয়ামেই তা হস্তান্তর করা হয় পরিবারের সদস্যদের কাছে।

সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার রকিব তার স্ত্রী ইমরানা কবির হাসিকে সঙ্গে নিয়ে গত ১২ মার্চ বেড়াতে যাচ্ছিলেন নেপালে। কাঠমান্ডুর ত্রিভুভন বিমানবন্দরে ইউএস বাংলার ওই উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হয়ে আরও ৪৮ জনের সঙ্গে রকিবের মৃত্যু হলেও প্রাণে বেঁচে যান হাসি।

রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হাসির অবস্থা এখনও ভালো নয়। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে নেওয়া হয়েছে সিঙ্গাপুরের একটি হাসপাতালে।

সোমবার বিকালে স্বজনদের সঙ্গে আর্মি স্টেডয়ামে এসে রকিবের মা কাঁদতে কাঁদতে বার বার বলছিলেন, “আমার একটাই ধন ছিলি তুই, আমাকে না বলে চলে গেলি! আমার আর কিছু থাকল না গো…। নয় বছর আগে স্বামীকে হারানো এই নারী এখন পড়েছেন বড় অসহায়ত্বের মধ্যে। তার ভাইয়ের স্ত্রী শাহী নূর বলেন, রকিবদের গ্রামের বাড়ি সিরাজগঞ্জে। রকিবের একটি বোন আছে, কিন্তু সেও থাকে বিদেশে।

আর্মি স্টেডিয়ামের গ্যালারির আরেক অংশে বসে তখন ডুকরে কাঁদছিলেন ইউএস-বাংলা দুর্ঘটনায় নিহত আঁখি মনির মা হাসিনা বেগম। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুরের রফিকুল ইসলাম পেশকারের মেয়ে আঁখির সঙ্গে গত ৩ মার্চ যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী মিনহাজ বিন নাসিরের বিয়ে হয়। বিয়ের ১৩ দিনের মাথায় হানিমুনে নেপালে যাওয়ার পথে ইউএস-বাংলার ওই উড়োজাহাজ দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয় তাদের।

আঁখির মা কাঁদতে কাঁদতে বলেন, “আমার একমাত্র মেয়ে। আমার অনেক আদরের ছিল ও। সুখ, দুঃখ সবকিছু ওর সঙ্গে শেয়ার করতাম। প্রত্যেকটা কাজ ওর সঙ্গে শেয়ার করতাম। ও অনেক কঠিন জিনিস সহজে নিতে পারত। আমার সেই মেয়ে চলে গেল।”

ইউএস-বাংলার ওই ফ্লাইটের পাইলট আবিদ সুলতান ও ফার্স্ট অফিসার পৃথুলা রশীদও দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন। পৃথুলার লাশ নিতে আর্মি স্টেডিয়ামে এসেছিলেন তার বাবা আনিসুর রশীদ ও মা রাফেজা বেগম। কান্নাভেজা কণ্ঠে রাফেজা বলেন, “আমার মেয়েকেতো হারিয়েছি। আরও অনেককে হারাইছি আমরা। যারা মারা গেছে সবার জন্য দোয়া চাই। এর বেশি আমি বলতে পারব না। মামা সাইফুর রহমান জানান, সন্ধ্যায় শ্যামলীর আশা টাওয়ারে পৃথুলার জানাজা শেষে মিরপুরে তাকে দাফন করেছেন তারা।

পাইলট আবিদ সুলতানের মরদেহ নিতে এসেছিলেন তার বড় ভাই অধ্যাপক খুরশিদ মাহমুদ, খালাতো ভাই মোস্তাফিজুর রহমান এবং ভায়রা ওয়ালিউর রহমান। মোস্তাফিজুর রহমান এ জানান, বিমান বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা আবিদের মরদেহ বনানীর সামরিক কবরস্থানে দাফন করা হবে।

ইউএস-বাংলার ওই ফ্লাইটের যাত্রী মো. নুরুজ্জামান বাবু রানার অটোমোবাইলসে চাকরি করতেন জুনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট ফোরম্যান হিসেবে। তিন সহকর্মী মিলে তারা নেপাল যাচ্ছিলেন কোম্পানির মেকানিকদের প্রশিক্ষণ দিতে। দুর্ঘটনায় তাদের তিন জনেরই মৃত্যু হয়েছে। নুরুজ্জামান বাবুর গ্রামের বাড়ি পাবনায়। পরিবার নিয়ে তিনি থাকতেন মিরপুর এলাকায়। তার মরদেহ নিতে আর্মি স্টেডিয়ামে গিয়েছিলেন তার মা নূর জাহান বেগম, স্ত্রী সুলতানা বেগম আর ছেলে হামিম জামান নিশাত।

বাবুর সহকর্মীরা যখন সান্ত্বনা দিয়ে ধৈর্য্য ধরতে বলছিলেন, নূর জাহান তখন বলছিলেন,“ক্যামনে ধৈর্য্য ধরুম, এই দিনে বেটা আমার গেছে। আবার এই দিনে কফিন হইয়া ফির‌্যা আসছে। ওরে আল্লাহ তুমি ক্যামন কইরা তুইল্লা নিলা।”

বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেডের (বিডিবিএল) রাজশাহী শাখার সাবেক সিনিয়র প্রিন্সিপল অফিসার নজরুল ইসলাম এবং তার স্ত্রী রাজশাহী সরকারি মহিলা কলেজের সাবেক শিক্ষক আখতারা বেগম অবসর জীবনে বিদেশ ভ্রমণে যাচ্ছিলেন নেপালে। ওই দুর্ঘটনায় তাদেরও প্রাণ যায়। তাদের মরদেহ নিতে আর্মি স্টেডিয়ামে এসেছিলেন তাদের দুই মেয়ে নারগিস আক্তার কনক ও নাজনীন আক্তার কাঁকন। বাবা-মায়ের লাশ নিয়ে তারা ফিরে গেছেন রাজশাহীতে।

ওই উড়োজাহাজের কেবিন ক্রু খাজা হোসেন মো. শফির স্ত্রী সাদিয়া রহমান ও আত্মীয়-স্বজনরা লাশ নিতে আসেন আর্মি স্টেডিয়ামে। সাদিয়া নিজেও ইউএস-বাংলার ক্রু। খাজার খালা শাশুড়ি সুরাইয়া আব্বাসী জানান, সাদিয়া যখন দোহা ফ্লাইটের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখনই দুর্ঘটনার খবর আসে। এক বছর দুই মাস আগে খাজার সঙ্গে সাদিয়ার বিয়ে হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *