আন্তর্জাতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা ও বহির্বিশ্বে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হচ্ছে প্রতিনিয়ত

গত আট বছরে বাংলাদেশের কূটনীতি সফল ধারায় এগিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশ ইতিবাচক সুনাম ও ভাবমূর্তি অর্জনে সক্ষম হয়েছে। আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কখনো ছিল বাংলাদেশের সরব উপস্থিতি আবার কখনো বাংলাদেশ ছিল নেতৃত্বের আসনে। প্রতিবেশীদের সঙ্গে পুরোনো বিরোধ মিটিয়ে সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া শেখ হাসিনার সরকারের অন্যতম বড় কূটনৈতিক সাফল্য। তাঁর সময়ে বিশ্বে ‘উন্নয়নের রোল মডেল’ হিসেবে বাংলাদেশ স্বীকৃতি পেয়েছে। এমনকি ২০১৬ সালের ১ জুলাই ঢাকার গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্টুরেন্টে ভয়াবহতম জঙ্গি হামলার ঘটনা বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিতে ছন্দপতন ঘটালেও গত কয়েক বছরেকঠোর হস্তে সন্ত্রাস দমনের মাধ্যমে সরকার তা সামলে উঠেছে। নিরাপত্তা ইস্যুতে বিদেশিদের আস্থা ফিরে আসতে শুরু করেছে।

২০০৯ সালে দায়িত্ব গ্রহণের পর ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে স্থল ও সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তি করাকে বর্তমান সরকারের সবচেয়ে বড় সাফল্য বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ভারতের সঙ্গে চার দশক ধরে ঝুলে থাকা স্থল সীমান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি ও ছিটমহলের মানুষের মুক্তির ঘটনা বিশ্বের জন্য নতুন দৃষ্টান্ত। একইসঙ্গে মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে সংঘাত ছাড়াই সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তিতে সরকার কূটনৈতিক সাফল্য দেখিয়েছে।

এই আট বছরে বাংলাদেশের সঙ্গে বৈশ্বিক যোগাযোগ ছিল খুবই ফলপ্রসূ ও স্পন্দমান। এই সময়ে ভারত, চীন, জাপান, কুয়েতসহ কয়েকটি বন্ধু রাষ্ট্রের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধান বাংলাদেশ সফর করেছেন। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন বাংলাদেশ সফর করেন। জাতিসংঘ মহাসচিব, ওআইসি, বিশ্বব্যাংকের প্রধানসহ বেশ কয়েকটি বহুপাক্ষিক সংস্থার প্রধানরাও বাংলাদেশে আসেন।

আর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘ, জি-৭, ওআইসি, ন্যাম, ডিএইট, সার্ক, আসেম-সহ বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ ও বিশ্ব রাজনীতিতে প্রভাবশালী বহুপাক্ষিক সংস্থা ও জোটে যোগ দিয়ে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছেন। পাশাপাশি তিনি ভারত, চীন, জাপান, সৌদি আরব, রাশিয়া, কানাডা, নেদারল্যান্ডস-সহ বহু দেশে দ্বিপাক্ষিক সফরে গেছেন। একইসঙ্গে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জোট ও সংস্থার সম্মেলনে অংশ নিয়েছেন।

বর্তমান সরকারের আমলে সংসদ বিষয়ক দুটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছে বাংলাদেশ। জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরিন শারমিন চৌধুরী কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি অ্যাসোসিয়েশন (সিপিএ) চেয়ারম্যান ও সংসদ সদস্য সাবের হোসেন চৌধুরী ইন্টার পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের (আইপিইউ) প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। এছাড়া জাতিসংঘভুক্ত ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠনের অসংখ্যপদে বাংলাদেশ দায়িত্ব পালন করেছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিচক্ষণ ও দূরদর্শী নেতৃত্বে বাংলাদেশ বিশ্ব পরিমণ্ডলে নিজের অবস্থানকে আরও শাণিত ও সুসংহত করেছে। ২০১৫ সালে প্রভাবশালী মার্কিন সাময়িকী ‘ফরেন পলিসি’ প্রধানমন্ত্রীকে বর্তমান বিশ্বের শীর্ষ চিন্তাবিদদের একজন হিসেবে ঘোষণা করে। ২০১৫ সালে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নেতৃত্বের স্বীকৃতি হিসেবে তাঁকে জাতিসংঘের পরিবেশ বিষয়ক সর্বোচ্চ সম্মান ‘চ্যাম্পিয়নস অব দ্য আর্থ’ পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। একই অধিবেশনে আইটিইউ প্রধানমন্ত্রীকে টেকসই উন্নয়নের জন্য আইসিটি পদক প্রদান করে। এছাড়া ইন্দিরা গান্ধী শান্তি পুরস্কার, প্লানেট ৫০-৫০ চ্যাম্পিয়ন, এজেন্ট অব চেঞ্জ, ইউনেস্কোর শান্তি বৃক্ষ পুরস্কারসহ অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হন প্রধানমন্ত্রী।

বহির্বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের অংশ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবাদ দমন এবং ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার প্রতিষ্ঠার বিষয়ে বাংলাদেশ গত কয়েক বছরে জোরালো ভূমিকা রেখেছে। পশ্চিমা বিশ্ব ও এই অঞ্চলে বাংলাদেশ সন্ত্রাস দমনের মডেল হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।

রানা প্লাজা ও তাজরীন গার্মেন্টসে দুর্ঘটনার পর বাংলাদেশের পোশাক শিল্প হুমকির মুখে পড়েছিলো। বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের কর্মপরিবেশ সম্পর্কে বহির্বিশ্বকে আশ্বস্ত করে যুক্তরাষ্ট্রের জিএসপি পুনর্বহাল এবং কানাডা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নে বিদ্যমান জিএসপি সুবিধা বহাল রাখতে সরকার সক্রিয় রয়েছে সবসময়।

শুধু দেশে নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশ অবদান রেখে চলেছে। ২০১১ সালে বাংলাদেশ সফরকালে জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে সর্বোচ্চ অংশগ্রহণ, সহস্রাব্দ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন, উন্নয়নে উদ্ভাবনী কৌশল প্রয়োগ, ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে দারিদ্র্য দূরীকরণ প্রভৃতি বিষয়ে অগ্রগামী ভূমিকার জন্য বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল বিশ্বের জন্য একটি ‘মডেল দেশ’ হিসেবে উল্লেখ করেন।

তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বাংলাদেশকে নিয়ে বিশ্বের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন এসেছে। বিশ্বে বহুমাত্রিক নিয়ন্ত্রক হওয়ার কারণেও বাংলাদেশের গুরুত্ব বাড়ছে। তাই স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোয় সমঝোতা ও আলোচনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সক্ষমতা আরও বাড়াতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *