চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নতিতে বাংলাদেশ সরকারের ভূমিকা

বর্তমানসরকারের আমোলে আমলে বাংলাদেশে চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নতি চোখে পড়ার মত।দেশের প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ গ্রামীণ মানুষের জীবনে এনেছে স্বস্তি। প্রথমদিকে সচেতনতার অভাবে কমিউনিটি ক্লিনিকে সেবা গ্রহিতাদের ভিড় না থাকলেও এখন ক্লিনিকগুলোতে রোগীর ভিড় ক্রমশ বাড়ছে। এই ক্লিনিকের মাধ্যমে গ্রামাঞ্চলের মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেয়া হচ্ছে।

প্রকল্প সূত্রে জানা যায়,বর্তমানে দেশে ১৩ হাজার ২৩৬টি কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে স্বাস্থ্য সেবা দেয়া হচ্ছে। এখানে ৩০ প্রকার ওষুধ বিনামূল্যে বিতরণের পাশাপাশি স্বাস্থ্য,পরিবার-পরিকল্পনা ও পুষ্টি বিষয়ক পরামর্শ দেয়া হয়। বাড়ির কাছের মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবার কারণে বড় ধরনের অসুখ ছাড়া উপজেলা ও জেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যাওয়া কমিয়ে দিয়েছে প্রান্তিক জনপদের মানুষেরা।

কয়েকটি কমিউনিটি ক্লিনিক পরিদর্শন করে জানা যায়, এখানে সার্বিক প্রজনন স্বাস্থ্য পরিচর্যার আওতায় গর্ভবর্তী মহিলাদের প্রসব পূর্ব (প্রতিষেধক টিকাদানসহ) এবং প্রসব পরবর্তী (নবজাতকের সেবাসহ) সেবা দেয়া হয়। মৌলভীবাজার জেলার জুড়ী উপজেলার ভুকতেরা কমিউনিটি ক্লিনিকে কথা বলে জানা যায়, এই কমিউনিটি ক্লিনিকে এ পর্যন্ত দু’শতাধিক নবজাতক প্রসব করানো হয়েছে।

কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে সময়মত প্রতিষেধক টিকাদান (যক্ষ্মা, ডিপথেরিয়া, হুপিং কফ, পোলিও, ধনুষ্টংকার, হাম, হেপাটাইটিস-বি, নিউমোনিয়া ইত্যাদি) শিশু ও কিশোর কিশোরীদের জন্য প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য সেবা দেয়া হয়। জনগণের জন্য বিশেষ করে মহিলা ও শিশুদের অপুষ্টি দূরীকরণের জন্য ফলপ্রসূ ব্যবস্থা গ্রহণ ও সেবা প্রদান করা হয়। ম্যালেরিয়া, যক্ষ্মা, কুষ্ঠ, কালা-জ্বর, ডায়রিয়াসহ অন্যান্য সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা এবং সেগুলোর চিকিৎসা সুবিধা রয়েছে। সাধারণ জখম, জ্বর, ব্যথা, কাটা/পোড়া, দংশন, বিষক্রিয়া হাঁপানী চর্মরোগ, ক্রিমি এবং চোখ, দাঁত ও কানের সাধারণ রোগের ক্ষেত্রে লক্ষণ ভিত্তিক প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান করা হয়। অস্থায়ী পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি সংক্রান্ত বিভিন্ন উপকরণ, যেমন-কনডম, পিল, ইসিপি ইত্যাদি সার্বক্ষণিক সরবরাহ ও বিতরণ নিশ্চিত করা হয়। জটিল রোগীদের প্রয়োজনীয় প্রাথমিক সেবা প্রদান করে দ্রুত উচ্চতর পর্যায়ে রেফার করা হয়। সদ্য বিবাহিত ও অন্তঃসত্ত্বা মহিলাদের নিবন্ধিকরণ ও সম্ভাব্য প্রসব তারিখ সংরক্ষণ করা হয়। মহিলা ও কিশোর-কিশোরীদের রক্তস্বল্পতা সনাক্ত এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা প্রদান করা হয়।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম কমিউনিটি ক্লিনিক প্রকল্পকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চিন্তা প্রসুত ফসল হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, রাজনৈতিক প্রতিহিংসাপরায়ন হয়ে এই প্রকল্প বন্ধ করে দিয়েছিল বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে প্রকল্পটি আবার চালু করে। আর এই প্রকল্পটি আজ বিশ্বে স্বাস্থ্যসেবার রোল মডেল হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান মার্গারেট চ্যান সম্প্রতি বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের সাফল্যকে রোল মডেল হিসেবে অনুসরণ করতে বিশ্ববাসীকে পরামর্শ দিয়েছেন। কমিউনিটি ক্লিনিকে সেবাগ্রহীতা ও সেবার মান বাড়ছে। ক্লিনিকের সুফল ভোগ করছে দেশের সাধারণ মানুষ। বাড়ির পাশেই বিনামূল্যে মিলছে স্বাস্থ্যসেবা। বর্তমানে প্রতি মাসে প্রায় এক কোটি মানুষ কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে সেবা নেন। তিনি বলেন, মা ও শিশু স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখছে কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো। প্রতিটি ক্লিনিকেই সরবরাহ করা হয়েছে ল্যাপটপ।

কমিউনিটি ক্লিনিক প্রকল্পের সাবেক প্রকল্প পরিচালক ডা. মমতাজুল হক বলেন, কমিউনিটি ক্লিনিকের সেবার কারণেই দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলসহ গ্রামীণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবার মান বেড়েছে। হাতের কাছে ফ্রি চিকিৎসা সেবা ও ওষুধ পেয়ে সবাই খুশি। কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার হওয়ায় সাধারণ মানুষের আস্থাও বেড়েছে।ভবিষ্যতে কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোই হবে দেশের স্বাস্থ্যসেবার পরিসংখ্যানের তথ্য ভান্ডার। স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি সেক্টর উন্নয়ন কর্মসূচির ২৭টি অপারেশনাল প্ল্যানের মধ্যে রয়েছে কমিউনিটি বেইজড হেলথ কেয়ার (কমিউনিটি ক্লিনিক প্রকল্প)। এইপ্রকল্পেরকার্যপরিধি ও অবকাঠামো সামনেআরওবৃদ্ধিপাবে।

প্রকল্প কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে ২০১০ সালে দুই কোটি ৩৬ লাখ মানুষ সেবা নেয়। ২০১১ সালে তিন কোটি ৭২ লাখ, ২০১২ সালে সাত কোটি ২২ লাখ, ২০১৩ সালে নয় কোটি ৮৫ লাখ, ২০১৪ সালে ১০ কোটির বেশি এবং ২০১৬ সালে প্রায় ১২ কোটি মানুষ সেবা নিয়েছে। জাতীয় জনসংখ্যা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের (নিপোর্ট) জরিপে দেখা গেছে, বাড়ির পাশের ক্লিনিক থেকে ওষুধ আর পরামর্শ নিয়ে ৮০ শতাংশ মানুষ সন্তুষ্ট। জাতীয় রোগ প্রতিরোধ ও সামাজিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান (নিপসম)-এর জরিপে দেখা যায়, সেবা নিয়ে ৯৮ শতাংশ মানুষ সন্তুষ্ট।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানায়, জনগণের স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও পরিবার পরিকল্পনা সেবার মান বৃদ্ধি ও সম্প্রসারণের লক্ষ্যে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় তৃতীয় সেক্টর কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। ৪র্থ সেক্টর কর্মসূচিতে ভিশন ২০২১, সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা, স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা এবং পুষ্টি নীতির আলোকে বাস্তবায়িত হবে।কমিউনিটি ক্লিনিকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কমিউনিটি ক্লিনিক কার্যক্রম এবং সেবাদানকারীদের করণীয় সম্পর্কে নির্দেশিকা প্রতিটি ক্লিনিকে রয়েছে। নির্দেশিকায় টাঙানো থাকায় চিকিৎসা ও ওষুধ নিয়ে অবৈধ কাজ করার সুযোগ থাকে না। এছাড়া ও নবজাতক শিশু মৃত্যুর হারে হ্রাসে ক্রম উন্নতির পথে রয়েছে বাংলাদেশ। জাতিসংঘ শিশু তহবিল ইউনিসেফ-এর নতুন বার্ষিক প্রতিবেদনে এমন তথ্যই উঠে এসেছে।

২০১৬ সালে বিশ্বজুড়ে নবজাতক শিশু মৃত্যুর পরিমাণ ও হারের ওপর নির্ভর করে বর্তমানে কোন দেশ শিশু জন্মের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এবং কোনটি সবচেয়ে বেশি নিরাপদ তার বিস্তারিত তালিকা প্রকাশ করে ইউনিসেফ। সেই তালিকায় ১৮৪টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ রয়েছে ৫৪ নম্বরে।

ইউনিসেফের ২০১৬ সালের জরিপ ও তথ্য বিশ্লেষণ অনুসারে, বাংলাদেশে নবজাতক শিশু মৃত্যুর হার (প্রতি এক হাজারে) ২০.১। অর্থাৎ গড়েপ্রতি৫০ টিজীবিতশিশুরমধ্যেজন্মেরপ্রথমএকমাসের মধ্যে ১ জনের মৃত্যু হয়। ২০১৫ সালের জরিপে এই হার ছিল ২৩।প্রতিবেশী দেশ ভারতের চেয়ে অনেক ভালো অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। নবজাতক জন্মের জন্য ঝুঁকির হিসেবে ভারতের অবস্থান ৩১ নম্বরে। ২০১৬ প্রতি হাজার হিসেবে দেশটিতে নবজাতক শিশু মৃত্যুর হার ২৫.৪। অর্থাৎ দেশটিতেওইবছর প্রতি ৩৯টি শিশুর মধ্যে একজন জন্মের প্রথম মাসেই মারা গেছে।

সেই তালিকায় সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে এক নম্বরে রয়েছে পাকিস্তান। তালিকায় দেখা গেছে, পাকিস্তানে প্রতি ২২ জনে একজন শিশু জন্মের প্রথম মাসে মারা গেছে। সেখানে নবজাতক মৃত্যুহার ৪৫.৬।

নতুন জরিপ প্রতিবেদনটিতে শিশু জন্মের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ দেশের সম্মান পেয়েছে জাপান। সেখানে ২০১৬ সালে প্রতি ১,১১১ শিশু জন্মে মাত্র একজন মারা গেছে প্রথম মাসে। অর্থাৎ ওই বছরে দেশটিতে নবজাতক শিশু মৃত্যুর হার মাত্র ০.৯।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *