নিরাপত্তার সাথে ধর্মীয় উৎসব পালনে সরকারের সহযোগীতা প্রশংসনীয়

বাংলাদেশে ধর্মীয় উৎসব
আমাদের দেশে অনেক সংকট আছে, এমনকি আছে অনেক দুর্বৃত্ত।যারা নানা বাহানায়, নানা অজুহাতে ধর্মীয় উৎসবে বিভেদ খোঁজে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করার পায়তারা খোঁজে। তারপরও,বাংলাদেশে প্রধান উৎসব এখনো ধর্মীয় উৎসব। এর বাইরে বাংলা নববর্ষ পহেলা বৈশাখ, বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবস এবং ২১শে ফেক্রয়ারি শহিদ দিবস জাতীয়ভাবে পালন করা হয়। মুসলানদের প্রধান দু’টি ধর্মীয় উৎসব ঈদ উল-ফিতর এবং ঈদ উল-আজহা। এর বাইরে মহরমের তজিয়া মিছিল অন্যতম।

মুসলমানদের ধর্মীয় উৎসব
ঈদ উল-ফিতর আমাদের দেশে অনেকটাই সর্বজনীন উৎসব। ঈদে পুরনো ঢাকায় যে আনন্দ মিছিল বের হয়, তাতে মুসলামান ছাড়াও সব ধর্মের মানুষ অংশ নিয়ে থাকে । ঐ শোভাযাত্রা অনেকটাই সামাজিক আনন্দ শোভাযাত্রায় পরিণত হয়েছে।ঈদে নতুন পোশাক পরার রেওয়াজ আছে । বাংলাদেশে একটা নতুন সংস্কৃতি অবশ্য ইতিমধ্যেই তৈরি হয়ে গেছে । আর তা হলো, ঈদের সময় যাদের সামর্থ থাকে, তিনি যে ধর্মের মানুষই হোন না কেন, নিজের এবং প্রিয়জনদের জন্যনতুন পোশাক কেনার চেষ্টা করে থাকেন । এছাড়া সব ধর্মের মানুষকে খাওয়ার আয়োজনে আমন্ত্রণ জানানোতো বহুকাল ধরেই চলে আসছে ।
ঈদ উল-আজহায়ও চিত্র  মোটামুটি একই। এই যেমন, সামর্থবান মুসলমানরা গরুর বাইরে অন্য পশুর মাংসেরও ব্যবস্থা রাখেন অন্য ধর্মের অতিথিদের জন্য।
বাংলাদেশে মহরমের তাজিয়া মিছিলের আয়োজন করে শিয়া সম্প্রদায়ের মানুষ৷ এটা কারবালার শোকাবহ স্মৃতিকে কেন্দ্র করে আয়োজন করা হয়৷। পুরনো ঢাকার হোসেনী দালান এলাকা থেকে সবচেয়ে বড় তাজিয়া মিছিল বের হয় এ সময়, যার দর্শনার্থী হয় সব ধর্মের মানুষ। মহরম উপলক্ষ্যে যেই মেলা বসে হোসেনী দালান, বকশিবাজার, ফরাশগঞ্জ ও আজিমপুরে সেই মেলাও সর্বজনীন।
ঈদ ই-মিলাদুন্নবী বা মহানবীর জন্মদিনেও বাংলাদেশের মুসলমানরা নানা আয়োজন করে থাকে। এর মধ্যে ঢাকায় জসনে জুলুস নামে রং-বেরঙের পতাকার ব্যানারে একটি আকর্ষণীয় মিছিল বের হয়।

হিন্দুদের ধর্মীয় উৎসব
বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা ।  তবে এই পূজার আমেজ শুধুমাত্র হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই । কারণ এই উৎসবেঅংশ নেয় সব ধর্মের মানুষ। প্রতিমা দেখা, পূজার প্রসাদ খাওয়াসহ সব আয়োজনেই থাকে সবার অংশগ্রহণ। এমনকি প্রতিমা বিজর্সনের সময়ও সবাই অংশ নেয়। পূজা উপলক্ষ্যে বসে মেলা, আয়োজন করা হয় নৌকা বাইচের। ঘোড়দৌড়েরও আয়োজন হয় কোথাও কোথাও। আয়োজন করা হয় নাটক, যাত্রাপালা এবং গানের আসরেও। এই সমস্ত আয়োজন সবাইকে এক করে। বলা বাহুল্য, পূজার উৎসবকে আরো বেশি সর্বজনীন রূপ দেয় এ সব আয়োজন।

বাংলাদেশে সরস্বতী পূজা সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যেন উৎসবের আমেজ নিয়ে আসে। বিশ্ববিদ্যালয়ের হলসহ স্কুল কলেজের খোলা চত্বরে বিদ্যাদেবীর এই পূজাও এক সর্বজনীন আয়োজন। শিক্ষার্থীরা সবাই মিলে এ আয়োজনকে সফল করে তোলে। লক্ষ্মী পূজায়ও হিন্দুরা আমন্ত্রণ জানায় সব ধর্মের মানুষকে। ধনের দেবী লক্ষ্মীকে কেউই আসলে অবহেলা করতে চান না। তারপর আসে কালীপূজা, যা সার্বজনীন মন্ডপে উদযাপন করা হয়।
শ্রীকৃষ্ণের জন্মদিন জন্মাষ্টমীর মিছিল আরেকটি আকর্ষণ বাংলাদেশে। এই মিছিলের রঙে সবাই আকৃষ্ট হয়। আর দোল উৎসবে রং খেলায় মেতে ওঠে সব ধর্মের তরুণ-তরুণীরা। এছাড়াও আছে রথযাত্রা, আছে চৈত্র সংক্রান্তি। চৈত্র সংক্রান্তি অবশ্য এখন আবহমান গ্রাম বাংলায় একটি ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। পহেলা বৈশাখের আগের দিন, অর্থাৎ চৈত্র সংক্রান্তিতে, মেলা বসে গ্রামে গ্রামে।
বাংলাদেশের কোনো কোনো অঞ্চলে হিন্দুদের চড়ক উৎসব নামে আরেকটি ধর্মীয় উৎসব পালিত হয়। চড়কের সঙ্গে থাকে মেলা ।

বৌদ্ধদের ধর্মীয় উৎসব
বৌদ্ধদের প্রধান উৎসব হলো বুদ্ধ পূর্ণিমা বা বৈশাখী পূর্ণিমা।  বুদ্ধদেবের জন্ম, গৃহত্যাগ, বুদ্ধত্ব লাভ, পরিনির্বাণ – সবই বৈশাখী পূর্ণিমায় ঘটেছিল, তাই এ উৎসব বৌদ্ধদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উৎসব। এছাড়া বৌদ্ধদের প্রবারণা পূর্ণিমায় ফানুস ওড়ানোর আকর্ষণ এড়াতে পারে না কোনো ধর্মের মানুষই। কয়েক বছর ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে প্রবারণা পূর্নিমায় সব ধর্মের মানুষ মিলে ফানুস ওড়ায়। আশ্বিন মাসের পূর্ণিমা তিথিতে প্রবারণা পালিত হয়। আর এই উৎসব শেষ হওয়ার পর প্রতিটি বৌদ্ধবিহারে পালিত হয় চীবর দান উৎসব।

খ্রিষ্টানদের ধর্মীয় উৎসব
খ্রিষ্টানদের সবচেয় বড় ধর্মীয় উৎসব ক্রিস্টমাস বা বড়দিন। যিশু খ্রিষ্টের জন্মদিন উপলক্ষ্যে এই উৎসব এখন বাংলাদেশে সর্বজনীন রূপ পেয়েছে। তাই গির্জায় গির্জায় বিশেষ প্রার্থনা, ভোজসভা এবং উপহার বিতরণে সব ধর্মের মানুষই অংশ নেয়। ঢাকার বড় বড় হোটেলে থাকে বড়দিনের বিশেষ আয়োজন। সাজানো হয় ক্রিসমাস ট্রি, থাকে স্যান্টা ক্লসও। শিশুরা স্যান্টা ক্লসের কাছ থেকে উপহার পেতে চায়। বাবা-মা তাদের শিশুদের নিয়ে সেখানে যান তাদের আনন্দ দিতে। অন্য ধর্মের কেউ কেউ ঘরেও ক্রিসমাস ট্রি সাজান এছাড়া ইস্টার সানডেও পালিত হয় কোথাও কোথাও।

আদিবাসীদের উৎসব
বাংলাদেশের আদিবাসীরা বাংলা নববর্ষে ‘বৈসাবি’ নামে একটি উৎসব পালন করে।এটাও ইতিমধ্যে সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকার প্রধান তিনটি আদিবাসী সমাজের বর্ষবরণ উৎসব এটি। ত্রিপুরাদের কাছে বৈসুক বা বৈসু, মারমাদের কাছে সাংগ্রাই এবং চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যাদের কাছে বিজু নামে পরিচিত। বৈসাবি নাম হয়েছে এই তিনটি উৎসবের প্রথম অক্ষর গুলো নিয়ে। এই বৈসাবি উৎসবে অংশ নিতে সারাদেশ থেকে উৎসাহীরা যান পার্বত্য চট্টগ্রামে।

এছাড়া ঢাকা, মানিকগঞ্জ, কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম প্রভৃতি অঞ্চলে মুসলমানদের মর্সিয়া, কাসিয়া, নারায়ণগঞ্জের লাঙ্গলবন্দে হিন্দুদের অষ্টমী স্নান, মৌলভীবাজারের মাধবপুর এবং সুন্দরবনের দুবলারচরে রাশ উৎসব ধর্মীয় সর্বজনীন উৎসবের উদাহরণ।
ইতিহাসবিদ অধ্যাপক ড. মুনতাসির মামুন ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘বাঙালির চিরায়াত ঐতিহ্য হলো ধর্মকে যার যার জায়গায় রেখে উৎসবকে ভাগাভাগি করে নেওয়া। আমি এবার বাগেরহাটে পূজা দেখতে গিয়েছিলাম। সেখানে ৬৫ জন স্বেচ্ছাসেবকের মধ্যে ৬০ জনই মুসলমান। প্রতিমা দেখার একটা ঐতিহ্য আছে আমাদের। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই প্রতিমা দেখছেন, অংশ নিচ্ছেন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে। তেমনি মুসলামনদের ধর্মীয় উৎসবেও অংশ নেন সব ধর্মের মানুষ।”

বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি রানা দাসগুপ্ত ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘যে যার ধর্ম আচারনিষ্ঠভাবে পালন করেন। কিন্তু উৎসব ভাগাভাগি করেন নেন। পূজা অথবা ঈদ-কোরবানি – দু’টোতেই আমরা তা দেখে আসছি। কোনো কোনো গোষ্ঠী মাঝে মাঝে তাদের স্বার্থে এই সম্প্রীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় বা নিয়েছে – এ কথা সত্য। কিন্তু তারা শেষ পর্যন্ত সফল হয় না। কারণ এখানে ধর্মের সঙ্গে হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতির মেলবন্ধন ঘটেছে।”

বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি প্রসঙ্গে শোলাকিয়ার ইমাম মাওলানা ফরিদ উদ্দিন মাসউদ বলেন, ‘‘ইবাদত-পূজা আর উৎসব – এ দু’টোকে গুলিয়ে ফেললে চলবে না। ইবাদত ও পূজার বাইরে যে উৎসব, তা তো সবার। এটা মানবিকতা। আমরা সব ধর্মের মানুষ, আমাদের উৎসবে পরস্পরকে আপন করে নেবো – এটাই তো ধর্মের শিক্ষা। বাংলাদেশের ঐতিহ্যও তাই। কিন্তু কেউ কেউ দু’টি বিষয়কে যখন গুলিয়ে ফেলেন, তখনই সমস্যা হয়’।’
তবে এই তিনজনই মনে করেন, অপশক্তি কখনোই সফল হবে না৷ বাংলাদেশে ধর্মীয় উৎসবের যে সর্বজনীন ঐহিত্য, তা ম্লান করা যাবে না কখনোই।

 প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘ধর্ম যার যার, কিন্তু উৎসব সবার। আমরা সকলে সেটাই মানি আর বাংলাদেশ বিশ্বে সেটার একটা দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। প্রত্যেকটা উৎসবে সবাই ভাইবোনের মতো কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আমরা এই উৎসবটা উদযাপন করে যাই। স্বাধীনতাসংগ্রামে এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় আমরা মুসলমানরা শুধু নয়, আমাদের সবধর্মের মানুষ—হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান সকলে মিলেই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বুকের রক্ত ঢেলে এ দেশ স্বাধীন করে গেছেন। বাংলাদেশ লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এবং এই বাংলাদেশে জাতি–ধর্ম–বর্ণনির্বিশেষে সকলে যার যার অধিকার নিয়েই বসবাস করবে, তাদের ধর্মকর্ম পালন করবে।এই দেশকে আমরা সকলে একসঙ্গে গড়ে তুলতে চাই। বাংলাদেশ উন্নত হোক, সমৃদ্ধিশালী হোক, দারিদ্র্যমুক্ত এবং ক্ষুধামুক্ত বাংলাদেশ হোক—এটাই ছিল জাতির পিতার স্বপ্ন। আমি এটুকু বলতে পারি, আমি বাবা, মা, ভাই—সব হারিয়েছি এবং আমরা দুটি বোন বেঁচে আছি। আমাদের জীবনের একটাই লক্ষ্য—এই বাংলাদেশটাকে আমরা গড়ে তুলব। লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা কখনো ব্যর্থ হতে পারে না।’

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *