পরিবার পরিকল্পনা বিষয়ক সচেতনতা বৃদ্ধিতে সরকারের উদ্যোগ প্রশংসনীয়

বছর বছর বিশ্ব জনসংখ্যা দিবসে একেকটি নতুন বাণী নিয়ে, নতুন প্রতিপাদ্য নিয়ে আমরা সরব হয়ে উঠি। ১৯৯০ থেকে ২০১৮ সাল। এ আটাশ বছরে দেয়া প্রতিপাদ্য বিষয় বিশ্লেষণ করলেই আমরা ফি-বছরের বিশ্বজনসংখ্যা দিবসের গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পারি। এ বিষয়ক ২০১৮ সালের প্রতিপাদ্য বিষয় হল : Family planning is a human right, অর্থাৎ পরিবার পরিকল্পনা একটি মানবাধিকার।

পরিবার, সমাজ ও বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে পরিবার পরিকল্পনা একটি সফল জনকল্যাণমুখী কার্যক্রম হিসেবে প্রশংসিত। আর জননন্দিত কার্যক্রম বলেই সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশে পরিবার পরিকল্পনা এখন সক্ষম দম্পতি ও তাদের পরিবারের জন্য মৌলিক মানবাধিকার হিসেবেই স্বীকৃত।

বাংলাদেশে পরিবার পরিকল্পনাকে ভিত্তি করে এমন মানবাধিকারের মূল্যবোধে সমুজ্জ্বল হতে, অঙ্গীকারবদ্ধ হতে প্রায় আটান্ন বছর লেগেছে। নানা পরিকল্পনা, নানা সরকারি-বেসরকারি কার্যক্রমের সময়োপযোগী সফল বাস্তবায়নের মাধ্যমে আজকে আমরা ষোলো কোটি মানুষের বাংলাদেশ। মা ও শিশুমৃত্যু রোধ, মা ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা, প্রতি সপ্তাহে ২৪ ঘণ্টা নিরাপদ ডেলিভারি, পরিবার পরিকল্পনা গ্রহীতাদের হার বৃদ্ধি, ক্রম হ্রাসমান টিএফআরসহ জনমিতিক সূচকের বলিষ্ঠ অগ্রগতি বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সম্মানসহ পুরস্কৃত করেছে। এর মধ্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এমন জনমিতিক লক্ষ পূরণে একাধিক আন্তর্জাতিক সম্মানে ভূষিত হয়েছেন।

এ উজ্জ্বল বাতিঘর নির্মাণে, কালস্রোতে পরিবার পরিকল্পনা ও জনসংখ্যা সীমিত রাখা বাস্তবায়নে, জনমানসে সচেতনতা বৃদ্ধিতে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুদূরপ্রসারী ভূমিকা চিরস্মরণীয়।

ক্লিনিক্যাল জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি বিংশ শতকের গোড়ার দিকে প্রথমে শুরু করেন আমেরিকার মার্গারেট স্যাঙ্গার (১৮৭৯-১৯৬৬), ইংল্যান্ডের মেরি স্টোপস্ (১৮৮০-১৯৫৮) এবং সুইডেনের নারীবাদী লেখিকা এলেনক্যারোলিনা সোফিয়া (১৮৪৯-১৯২৬)।

মার্গারেট স্যাঙ্গার ১৯২৪ সালের দিকে ‘birth control’ শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন। মার্গারেট দুনিয়াব্যাপী জন্মনিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমকে জনপ্রিয় করতে নোবেল বিজয়ী বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শরণাপন্ন হন। সে সময় রবীন্দ্রনাথ ছিলেন তুমুল নন্দিত কবি। এর মধ্যে মার্গারেট রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে কবির শিশু কাব্যের ‘জন্ম কথা’কবিতাটি ইংরেজি অনুবাদ করে ‘The Birth Control Review’-তে প্রকাশ করেন। জন্মকথার ইংরেজি নাম দিলেন : ‘The Beginning’।

১৯২৫ সালে মার্গারেট স্যাঙ্গার তার অভীষ্ট লক্ষ্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে জন্মনিয়ন্ত্রণ নিয়ে আলোচনা করেন। কিন্তু মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে তিনি উল্টো মতামত পেলেন। গান্ধীজি বললেন : জন্মনিয়ন্ত্রণ নয়, সংযম ও ব্রহ্মচর্য পালনের কথা।

১৯২৫ সাল। রবীন্দ্রনাথ এক চিঠিতে স্যাঙ্গারকে জন্ম নিয়ন্ত্রণ আন্দোলন সম্পর্কে লিখলেন : ‘এ আন্দোলন নারীদিগকে বাধ্যতামূলক এবং অযথা মাতৃত্বের দায় হইতে রক্ষা করিবে কেবলমাত্র তাহাই নহে, অতিরিক্ত লোকসংখ্যা কমাইয়া ইহা পৃথিবীর শান্তি রক্ষায়ও সহায়তা করিবে। ভারতবর্ষের মতো ক্রমবর্ধমান ক্ষুধাপীড়িত দেশে, যাহাদিগকে যথাযথভাবে ভরণপোষণ করা যাইবে না এমন সন্তানের জন্ম দেয়া অতীব নিষ্ঠুর অপরাধ। …এ অত্যাচার চলিতে দেয়া কর্তব্য নহে।’

রবীন্দ্রনাথ নিজে মা-বাবার চতুর্দশতম সন্তান। নিজেকে নিয়ে এ অবস্থানে থেকে তিনি মাঝে মাঝে মস্করা করতেন। রবীন্দ্রনাথ একবার ১৯৩২ সালে শ্রীমতি নীলিমা দাশকে এক চিঠিতে জানালেন,‘অবাধ সন্তান জন্মের যে দুঃখ দৈন্য অপমান কত, আমাদের চারিদিকেই তা দেখতে পাই …আজকের দিনে পৃথিবীতে যত অশান্তি, যত যুদ্ধ, পর রাষ্ট্রের প্রতি যত অন্যায়, তার মূল কারণ অতি প্রজনন।’কবির মতে, ‘পিতামাতার যা ভালো ভালো গুণ, ভালো স্বাস্থ্য, তা সর্বপ্রথম বড় সন্তান পায়। দ্বিতীয় তৃতীয় সন্তান ও অনেকটা গুণ পায়। তারপর সবকিছুই কমতে থাকে।’

বাংলাদেশে ষাটের দশক থেকে সরকারিভাবে পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি চালু হয়। ১৯৭৪ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বতন্ত্র পরিবার পরিকল্পনা বিভাগ গঠন করেন। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় (১৯৭৩-১৯৭৮) জনসংখ্যা সমস্যাকে ১নং জাতীয় সমস্যা হিসেবে তিনি চিহ্নিত করেন। অগাধ দেশপ্রেম ও নিয়ন্ত্রিত জনগণের স্বাস্থ্যসেবার জন্য বঙ্গবন্ধু ‘পপুলেশন কন্ট্রোল’-কে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিলেন। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি। সংবিধানের ৪র্থ সংশোধনীর উদাত্ত ভাষণে তিনি বললেন : ‘এদেশে মানুষ বাড়ছে। বৎসরে ৩০ লাখ লোক বাড়ে। আজকে তাই পপুলেশন প্লানিং করতে হবে। না হলে ২০ বছর পর ১৫ কোটি লোক হয়ে যাবে। আর ২৫ বছর পরে? …৫৫ হাজার বর্গমাইল জায়গায় এত লোক বাঁচাতে পারব না। যত ক্ষমতাই থাকুক, বাঁচার উপায় নেই। অতএব ‘পপুলেশন কন্ট্রোল’আমাদের করতেই হবে। সেজন্য ডেফিনিট স্টেপ নিতেই হবে বাংলাদেশে।’

“দুটি সন্তানের বেশি নয়, একটি হলে ভালো হয়”- এমন মোক্ষম জনপ্রিয় স্লোগান ধারণ করে এদেশে চলছে পরিবার পরিকল্পনা ও মা-শিশু স্বাস্থ্য কর্মসূচি। এখন প্রশ্ন হল, বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ায় এ দেশে জনসংখ্যা কি সমস্যা না সম্পদ এ বিতর্ক এখনও আছে। সীমিত ছোট্ট ভূখণ্ডের বাংলাদেশে ভবিষ্যতেও এ চিন্তা চলবে। কৃষি, কারিগরি শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন, বৈদেশিক মুদ্রার বিরাট সঞ্চয়সহ জনগণের জীবনমান ও গড় আয়ু বৃদ্ধি পেলেও একবিংশ শতকের বাংলাদেশ কি অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ ও চাহিদা মেটাতে তার আবাদযোগ্য জমি হারাবে না? আমাদের শঙ্কাটা ভেতরে ভেতরে সেখানেই। এদেশে মানুষের মাথার সংখ্যা বাড়ছে। অথচ বাসযোগ্য-চাষযোগ্য জমির আয়তন বাড়ছে না। তারপর রয়েছে প্রাকৃতিক বিপর্যয়।এজন্যই জনসংখ্যা সীমিত রাখতে, পরিবার পরিকল্পনা সেবা গ্রহণ এখন এদেশের সবার, পরিবারের, উদ্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর জন্য অনিবার্য পালনীয় মানবাধিকার।

চলমান গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমঃ

নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করার লক্ষে প্রতি উপজেলায় ৩টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে ২৪ঘন্টা/৭দিন স্বাভাবিক প্রসব সেবা প্রদান করা হচ্ছে। যার ফলে অত্র উপজেলায় প্রাতিষ্ঠানিক প্রসব সেবার হার বৃদ্ধি পাচ্ছে। মাতৃমৃত্যু,এবং নব জাতাকের মৃত্যৃ হ্রাস এই কার্যক্রমেরএকটি অন্যতম সফলতা। এই লক্ষে প্রতিটি গর্ভবতী মায়ের মোবাইল নাম্বার সহ তালিকা সংরক্ষণ, যথাসময়ে গর্ভবতী মায়ের কাছে সেবা পৌছে দেয়া এবং ঝুকি নিরূপন ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নিমিত্ত অত্র বিভাগ নিরলস ভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তি, ইমাম/খতিব, ম্যারেজ রেজিস্টার, নব বিবাহিত দম্পতি, স্কুল ও মাদ্রাসার শিক্ষক এবং ছাত্র-ছাত্রীদের অংশগ্রহণে বাল্য বিবাহ রোধ, প্রজনন স্বাস্থ্য, মা ও শিশু স্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা সেবা সহ  বিভিন্ন বিষয়ে কর্মসূচী গ্রহণের মাধ্যমে অত্র বিভাগ জনগণকে উদ্বুদ্ধকরণ এবং সমাজে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষে কাজ করে যাচ্ছে। অত্র কার্যালয়াধীন মাঠ পর্যায়ে কর্মরত পরিবার কল্যাণ সহকারী দ্বারা সপ্তাহে ০৩ (তিন) দিন বাড়ী-বাড়ীতে এবং ০৩ (তিন) কমিউনিটি ক্লিনিকে সেবা প্রদানের মাধ্যমে জনগণের স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করা হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *