প্রিমিয়ার ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ১০ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪২ শতাংশে
-
- - নিজস্ব -
- প্রতিবেদক --
- ১৩ জানুয়ারী, ২০২৬
১৯৯৯ সালে যাত্রার শুরু থেকেই প্রিমিয়ার ব্যাংক একটি চাকচিক্যময় ভাবমূর্তি ধরে রেখেছিল। কিন্তু মাত্র এক বছরে খেলাপি ঋণ প্রায় পাঁচ গুণ বেড়ে যাওয়ায় এখন সেই ভাবমূর্তি ধসে পড়তে শুরু করেছে। ব্যাংকটির আর্থিক বিবরণী এতটাই বেহাল যে তা আর লুকিয়ে রাখা সম্ভব হচ্ছে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের সেপ্টেম্বর শেষে তৃতীয় প্রজন্মের এই ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ বেড়ে ৪২ শতাংশ বা ১৩ হাজার ৯৫৯ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। অথচ ২০২৪ সালের একই মাসে এই হার ছিল ১০ শতাংশ এবং তার আগের বছর তা ছিল ৫ শতাংশেরও নিচে।
খেলাপি ঋণের এই উল্লম্ফনের কারণে বাণিজ্যিক ব্যাংকটিকে বড় অঙ্কের প্রভিশন বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি রাখতে হয়েছে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, প্রভিশন রাখার ক্ষেত্রেও ব্যাংকটি ব্যর্থ হয়েছে। তাদের প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ৪৮ কোটি টাকা।
আর্থিক অবস্থার অবনতির সঙ্গে সঙ্গে আমানতকারীরা টাকা তুলে নিতে শুরু করেন। এর সঙ্গে যোগ হয় নিয়ন্ত্রক সংস্থার হস্তক্ষেপ এবং পর্ষদে পরিবর্তন। সব মিলিয়ে গত বছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে ব্যাংকটি ৬৭৭ কোটি টাকা নিট লোকসান গুনেছে।
২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ব্যাংকটির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান এইচ বি এম ইকবাল ২৬ বছরের দায়িত্ব শেষে পর্ষদ থেকে সরে দাঁড়ান। এরপরই পরিস্থিতির অবনতি আরও দৃশ্যমান হতে থাকে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, প্রিমিয়ার ব্যাংকের ঋণের বড় একটি অংশ মাত্র ২৪ জন গ্রাহকের কাছে গেছে, যাদের অনেকেই এখন খেলাপি।
শীর্ষ ঋণগ্রহীতাদের মধ্যে রয়েছে বসুন্ধরা, ব্লু প্ল্যানেট, ওয়েস্টার্ন ইঞ্জিনিয়ারিং (প্রা.) লিমিটেড, কর্ণফুলী, ক্রনি, ভিনসেন কনসালট্যান্সি প্রা. লিমিটেড, জাজ ভূঁইয়া, আব্দুল মোনেম লিমিটেড, সাদ মুসা, এসিআই, ডায়মন্ড এবং ডরিন।
ব্যাংক কর্মকর্তারা জানান, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলে যাওয়ায় ব্যবসার পরিবেশ সংকুচিত হয় এবং ঋণ আদায় ধীর হয়ে পড়ে। বিগত সরকারের সঙ্গে সম্পৃক্ত অনেক ব্যবসায়ী কার্যক্রম গুটিয়ে নিয়েছেন, আইনি ঝামেলায় পড়েছেন বা দেশ ছেড়েছেন। এ ছাড়া ঋণ শ্রেণিকরণের নিয়ম কড়াকড়ি করার ফলেও খেলাপি ঋণ বেড়েছে।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গত বছরের আগস্টে কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রিমিয়ার ব্যাংকের পর্ষদ ভেঙে দিয়ে সাত সদস্যের নতুন পর্ষদ গঠন করে। প্রতিষ্ঠাতা ভাইস চেয়ারম্যান এবং উদ্যোক্তা শেয়ারহোল্ডার আরিফুর রহমানকে চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া হয়। বর্তমানে তিনিই ব্যাংকের কার্যক্রম তদারক করছেন।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার এই হস্তক্ষেপের মধ্যে ব্যাংকটির আমানতের প্রবৃদ্ধিও কমে গেছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে যেখানে মোট আমানত ছিল ৩৪ হাজার ৭৬৬ কোটি টাকা, গত সেপ্টেম্বরে তা কমে ৩৩ হাজার ৫৮৭ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
চেয়ারম্যান আরিফুর রহমান বলেন, বর্তমান দুর্বল আর্থিক অবস্থা মূলত বিগত বছরগুলোর পুঞ্জীভূত সমস্যার ফল। তিনি বলেন, 'তবে আমরা কার্যক্রম স্থিতিশীল করার চেষ্টা করছি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি সহায়তায় বেশ কিছু ঋণ পুনঃতফসিল করা হচ্ছে। ফলে ডিসেম্বর প্রান্তিকে খেলাপি ঋণ কমতে শুরু করেছে।'
লোকসানের কারণ হিসেবে তিনি বাড়তি প্রভিশন রাখার বাধ্যবাধকতাকে দায়ী করে বলেন, প্রভিশন ঘাটতি মেটাতে তারা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে সময় চাইবেন। তিনি আরও বলেন, বিগত সরকারের ঘনিষ্ঠ অনেক ব্যবসায়ী পলাতক, কারাগারে বা ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়ায় খেলাপি ঋণ বেড়েছে। ঋণ শ্রেণিকরণের নিয়ম পরিবর্তনও এর একটি কারণ।
বাংলাদেশ ব্যাংক, বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্তে সাবেক চেয়ারম্যান এইচ বি এম ইকবালের সময়ে প্রিমিয়ার ব্যাংকে নানা অনিয়ম উঠে এসেছে।
এর মধ্যে রয়েছে ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যাংকের সম্পদ ব্যবহার, অস্বাভাবিক চড়া সুদে আমানত রাখা, জব্দ করা হিসাব থেকে টাকা উত্তোলন এবং বিজ্ঞাপনের নামে তহবিল আত্মসাৎ।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদন্তে দেখা গেছে, ২০২০ সাল থেকে ৪০ মাসেরও বেশি সময় ধরে ইকবাল ও তার পরিবারের সদস্যরা বনানীর ইকবাল সেন্টারের ২০ ও ২১ তলার ভাড়া বাবদ ১০ কোটি ৩১ লাখ টাকা নিয়েছেন। অথচ ব্যাংক ওই ফ্লোরগুলো ভাড়াও নেয়নি বা ব্যবহারও করেনি।
প্রিমিয়ার ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় ইকবাল ও তার পরিবারের মালিকানাধীন ইকবাল সেন্টারে অবস্থিত। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মতে এটা ব্যাংকিং বিধির স্পষ্ট লঙ্ঘন। সাবেক সংসদ সদস্য ইকবাল প্রিমিয়ার গ্রুপ অব কোম্পানিজ লিমিটেডেরও চেয়ারম্যান।
বিএফআইইউর তদন্তে দেখা গেছে, সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম রিয়াজুল করিমসহ কিছু ব্যাংক কর্মকর্তা ৩ কোটি ৪৪ লাখ টাকা পাচারে সহায়তা করেছেন। এ ছাড়া ক্রেডিট কার্ডের অপব্যবহারের মাধ্যমে সাবেক চেয়ারম্যান ও তার পরিবারকে বিদেশে বৈদেশিক মুদ্রা পাঠাতে সহায়তা করেছেন তারা।
বিএফআইইউ আরও জানতে পেরেছে, ইকবাল ও তার পরিবারের চার সদস্য অনুমোদিত সীমার বাইরে গিয়ে প্রিমিয়ার ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে বিদেশে সম্পদ কেনা ও লেনদেন করেছেন।
বিজ্ঞাপন ও প্রচারের নামে ৮ কোটি ১৭ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে সাবেক চেয়ারম্যান এইচ বি এম ইকবাল, তার দুই ছেলে, ব্যাংকের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা, পর্ষদ সদস্য এবং একটি বিজ্ঞাপনী সংস্থার এমডিসহ ১৫ জনের বিরুদ্ধে পাঁচটি মামলা করেছে দুদক।
অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে বর্তমান চেয়ারম্যান আরিফুর রহমান বলেন, 'আমি এ বিষয়ে মন্তব্য করতে চাই না। দুদক বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে।'
সরকার পরিবর্তনের পর ইকবাল দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, তিনি বর্তমান চেয়ারম্যান ও অন্য কর্মকর্তাদের হুমকি দিয়েছেন।
প্রধান কার্যালয় সম্পর্কে আরিফুর রহমান বলেন, 'এই অফিসের ভাড়া অনেক বেশি। আমরা কম ভাড়ায় অন্য কোথাও অফিস খুঁজছি। শিগগিরই ইকবাল সেন্টার থেকে অফিস সরিয়ে নেব।'
বর্তমানে ব্যাংকটিতে ফরেনসিক অডিট চলছে। ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ আবু জাফরকে ছুটিতে পাঠানো হয়েছে এবং ওয়ান ব্যাংকের সাবেক এমডি মনজুর মফিজকে অতিরিক্ত এমডি হিসেবে নিয়োগ দিয়ে ভারপ্রাপ্ত এমডির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।