প্রকৌশল শিক্ষার মানোন্নয়নে ঢাকায় আন্তর্জাতিক সিম্পোজিয়াম শেষ, ঘোষিত হলো রূপরেখা

প্রকৌশল শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি জোরদারের লক্ষ্য নিয়ে আয়োজিত “৪র্থ আন্তর্জাতিক সিম্পোজিয়াম অন কোয়ালিটি অ্যাস্যুরেন্স ইন ইঞ্জিনিয়ারিং এডুকেশন” ঢাকায় শেষ হয়েছে। মঙ্গলবার রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল ঢাকার গ্র্যান্ড বলরুমে দুই দিনব্যাপী এই আয়োজনের সমাপনী অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়।

বোর্ড অব অ্যাক্রেডিটেশন ফর ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনিক্যাল এডুকেশন (BAETE) এবং ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, বাংলাদেশ (IEB)–এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এ সিম্পোজিয়ামে দেশের নীতিনির্ধারক, আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ, শিক্ষাবিদ ও পেশাজীবীরা অংশ নেন।

সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনের শুরুতে প্রফেসর ড. নূর ইয়াজদানি এবিইটি (ABET) ও বিএইটিই-এর অ্যাক্রেডিটেশন ব্যবস্থা নিয়ে বক্তব্য দেন। তিনি আন্তর্জাতিক ও জাতীয় অ্যাক্রেডিটেশন কাঠামোর তুলনামূলক বিশ্লেষণ তুলে ধরে বলেন, মানসম্পন্ন প্রকৌশল শিক্ষা নিশ্চিত করতে শক্তিশালী মাননিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা অপরিহার্য।

প্রফেসর ড. আনিসুল হক টেকসই উন্নয়ন ও উদ্যোক্তা তৈরিতে ফলাফলভিত্তিক মূল্যায়ন ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দেন।

প্রফেসর ড. মো. আশরাফুল আলম প্রকৌশল শিক্ষায় টেকসই উন্নয়ন ধারণা যুক্ত করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।

ড. প্রু হাওয়ার্ড ও ড. রব জারম্যান যৌথ আলোচনায় প্রকৌশল শিক্ষায় সামাজিক ও প্রযুক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি যুক্ত করার ওপর জোর দেন।

ড. বৈশাখী বোস নতুন প্রজন্মের শিক্ষকদের জন্য ফলাফলভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থার চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেন।

প্রফেসর ড. স্বাক্ষর শতাব্দা ও ড. সাদিদ মুনীর আধুনিক প্রযুক্তির যুগে অভিযোজন ক্ষমতা, সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি ও আজীবন শিক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরেন।

প্রফেসর ড. সালেকুল ইসলাম প্রকৌশল শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধি ও সক্ষমতা গঠনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

সমাপনী অধিবেশনে আইসিটি–বিষয়ক বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমেদ তৈয়্যব বলেন,
“বাংলাদেশে শিক্ষা ব্যবস্থায় আরও উন্নতি করার অনেক সুযোগ রয়েছে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়েছে, কিন্তু মানসম্মত শিক্ষা এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষায় এ ধরনের আন্তর্জাতিক আয়োজন মানোন্নয়নের পথে আমাদের অনেকখানি এগিয়ে দেবে। আমাদের শিক্ষার্থীদের জন্য মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে এবং দক্ষ গ্র্যাজুয়েট তৈরিতে আরও বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।”

পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন,“নদীশাসনের নামে পানি উন্নয়ন বোর্ডের অনেক প্রকৌশল কার্যক্রমে নদী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে—আমি দীর্ঘদিন এ বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছি। সরকারে এসে এখন উল্টো দিকটিও দেখছি—অনেকে জনসম্পদ রক্ষায় নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করছেন, যদিও আরও ভালোভাবে করার সুযোগ ছিল। আমাদের ড্যাপ রয়েছে ঢাকাকে বাসযোগ্য করার জন্য, অথচ বাস্তবে ঢাকাই এখন সবচেয়ে অবাসযোগ্য। ইঞ্জিনিয়ারদের সামাজিক ও পরিবেশগত দায়বদ্ধতা আরও গভীরভাবে নিতে হবে। শুধুমাত্র প্রকৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকে সব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।”

সমাপনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন BAETE-এর চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. তানভীর মনজুর। তিনি বলেন,

“এই সিম্পোজিয়ামের মূল লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের প্রকৌশল শিক্ষাকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা এবং একটি টেকসই মাননিয়ন্ত্রণ কাঠামো গড়ে তোলা। দুই দিনের আলোচনা থেকে আমরা একটি স্পষ্ট রূপরেখা পেয়েছি—যার মাধ্যমে অ্যাক্রেডিটেশন ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা হবে, শিক্ষকদের দক্ষতা বাড়ানো হবে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে বৈশ্বিক মানের দিকে পরিচালিত করা হবে।”

সম্মেলনের শেষে আয়োজকেরা একটি কর্মপরিকল্পনার রূপরেখা ঘোষণা করেন। এতে অ্যাক্রেডিটেশন সক্ষমতা বৃদ্ধি, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, শিল্পখাতের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংযোগ জোরদার এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

আয়োজকদের আশা, এই সিম্পোজিয়ামের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রকৌশল শিক্ষা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও সুদৃঢ় অবস্থান তৈরি করবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার পথ সুগম হবে।

পাঠকের মন্তব্য