শততম টেস্ট, দীপ্তিমান-শাশ্বত মুশফিক

ক্রিকেট ছোট থেকে আরও ছোট হচ্ছে। টি-টোয়েন্টি, দ্য হান্ড্রেড আর সিক্সেসের মতো প্রতিযোগিতার ভিড়ে আকর্ষণ হারানোর শঙ্কায় শতবর্ষী টেস্ট ক্রিকেট। কিন্তু ক্রিকেটের বর্তমান বাণিজ্যিকীকরণের যুগেও কেউ কেউ সাদা পোশাকে খেলাকেই অগ্রাধিকার দেন। তারা ভালোবাসেন লাল বলের ক্রিকেটকে, কারণ একজন ক্রিকেটারের সামর্থ্য, একাগ্রতা, ধৈর্য এর সঙ্গে জড়িয়ে। মুশফিকুর রহিম তাদেরই একজন। 

আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ও ওয়ানডে ছেড়ে এখন তার পুরো মনোযোগ লাল বলের ক্রিকেটে। বাংলাদেশের এই অভিজ্ঞ ক্রিকেটারকে নিয়ে চর্চা চলছে গত কয়েকদিন ধরে। তার ক্যারিয়ারের এমন একটি দিনের প্রতীক্ষা ফুরাচ্ছে, যা ২৫ বছর আগে বাংলাদেশের টেস্ট অভিষেকের পর থেকে কেউ সম্ভবত কল্পনাও করেননি।

আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে বাংলাদেশের ঢাকা টেস্ট বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপের অন্তর্ভুক্ত না হলেও অন্যরকম মর্যাদা পাচ্ছে। শুধুমাত্র মুশফিকের জন্য। এটি তার অনন্য মাইলফলকের ম্যাচ, শততম টেস্ট। দেশে এখন অন্যতম আলোচিত বিষয় মুশফিকের এই অর্জন। শুভাকাঙ্ক্ষীদের শুভেচ্ছা আর শুভকামনায় ভাসছেন ডানহাতি ব্যাটার। 

২০০৫ সালে ঐতিহাসিক লর্ডসে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্ট দিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পথচলা শুরু হয় মুশফিকুর রহিমের

১০০তম টেস্ট খেলা ক্রিকেটারদের সংখ্যা ভুরি-ভুরি। মুশফিক এই তালিকায় যোগ দিচ্ছেন ৮৪তম ক্রিকেটার হিসেবে এবং এশিয়ানদের মধ্যে ২৭তম। এ ছাড়া প্রথম বাংলাদেশি হয়ে শততম টেস্ট খেলছেন তিনি। দেশের দুই যুগেরও বেশি সময়ের টেস্ট ইতিহাসে তার আগে ৪০ জন ক্যাপ পেয়েছেন। হাবিবুল বাশার, মোহাম্মদ আশরাফুল ও মোহাম্মদ রফিকদের মতো সাবেক তারকাদের সঙ্গে তার অভিষেক। তার কাছাকাছি সময়ে টেস্ট ক্যাপ পেয়েছেন সাকিব আল হাসান, তামিম ইকবাল ও মাহমুদউল্লাহরা। তাদের প্রত্যেকে ঝরে পড়েছেন, কিন্তু টিকে গেছেন কেবল মুশফিক।

২০০৫ সালের কথা। বয়স ১৮ পূর্ণ হয়েছে সবে। ক্রিকেটের পুণ্যভূমি লর্ডসের সবুজ ঘাসে পা রাখলেন মুশফিক। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্ট অভিষেক হওয়া লাজুক স্বভাবের সেই ছেলেটা ২০ বছর পর আজ (১৯ নভেম্বর) শেরে-ই বাংলার মাঠে পা রাখবেন ইতিহাস হয়ে। যেখানে অসংখ্যবার তার পা পড়েছে, সেখানে এবার পা ফেলবেন অন্যরকম এক আবেগ আর গৌরব নিয়ে।

মুশফিকের এই অর্জনের স্বাক্ষী হবেন হাজার হাজার ক্রিকেট ভক্ত-সমর্থকরা। সতীর্থরা সিক্ত করবেন ভালোবাসা দিয়ে। বোর্ডও তাকে জানাবে বিশেষ সম্মাননা। ম্যাচটি তার জন্য স্মরণীয় হয়ে থাকবে, এটাই প্রত্যাশা।

অভিষেক ম্যাচে ফেরা সেই ব্যাগি-গ্রিন এখনও সাদা পোশাকে তার নিত্য সঙ্গী

মুশফিক নিজেও চাইবেন মনে রাখার মতো ইনিংস খেলতে। স্বাভাবিকভাবে তার মনে রোমাঞ্চ কাজ করছে। কদিন আগে ব্যাটের হাতলে প্রথম টেস্ট ক্যাপ ঝুলিয়ে একটি ছবি ফেসবুকে পোস্ট করে সেটি জানিয়ে দেন তিনি, ‘সকল উত্থান-পতনের সঙ্গী।’

এই ক্যাপটির বয়স ২০ বছরেরও কিছুটা বেশি। ২০০৫ সালের ২৬ মে লর্ডস টেস্টে হাবিবুল বাশারের কাছ থেকে এই ক্যাপ মাথায় পরেন মুশফিক। প্রথমবার সেই ক্যাপ পরে নিজের সম্ভাবনাও দেখান। সেদিন ইংলিশ বোলারদের সামনে অসহায় আত্মসমর্পণ করেছিল বাংলাদেশের টপ অর্ডার। আর মুশফিক ১৯ বলের ইনিংস খেলেছিলেন ৫৬ বলে। ৮৫ মিনিট ক্রিজে দাঁত কামড়ে পড়ে থেকে বুঝিয়ে দেন, তিনি এখানে থেকে যেতে চান। 

সেই দিনের পর দুই দশক কেটে গেছে। ব্যাগি গ্রিন ধূসর হয়ে গেলেও, তিনি ভাস্বর। মুশফিক দলের সবচেয়ে অভিজ্ঞ ক্রিকেটার, হয়ে উঠেছেন দলের ব্যাটিং স্তম্ভ। এই জায়গায় আসতে কখনও ছন্দপতন হয়েছে। তবে উন্নতির গ্রাফ ছিল ঊর্ধ্বমুখী। ধীরে ধীরে আরও পরিণত হয়েছেন মুশফিক। প্রথম ৫০ টেস্টে তার গড় ছিল ৩২–এর নিচে। পরের ৪৯ টেস্ট শেষে তার ব্যাটিং গড় ৪৫–এর কাছাকাছি। ২০১৭ সাল থেকে তার চেয়ে বেশি গড়ে রান করেছেন কেবল আর চার ব্যাটার।

মুশফিকের নামের পাশে তিনটি ডাবল সেঞ্চুরি। এর মধ্যে উইকেটকিপার হিসেবে দুটি, যা বিশ্বরেকর্ড। তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ প্রথমবার ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া ও শ্রীলঙ্কার মতো দলগুলোকে হারানোর স্বাদ পায়। ২০১১ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত অধিনায়কত্ব করেছেন তিনি ৩৪ ম্যাচে। নেতৃত্বে থেকেই ২০১৩ সালে গলে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে ডাবল সেঞ্চুরির মাইলফলক স্পর্শ করেন। এই শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে তার সেঞ্চুরি সবচেয়ে বেশি– চারটি।

মুশফিকের পরের দুটি ডাবল সেঞ্চুরি জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে। ২০১৮ সালে তার করা অপরাজিত ২১৯ রান এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের কোনো ব্যাটারের সর্বোচ্চ। ৯৯ টেস্টে ৪৮.৪০ গড় এবং ১২ সেঞ্চুরি ও ২৭ হাফ সেঞ্চুরিতে ৬৩৫১ রান করে এখনই দেশের সর্বকালের সেরা ব্যাটার তিনি। সেরা ইনিংসের তালিকায় প্রথম ছয়টির মধ্যে চারটিই তার।

এশিয়ায় মুশফিকের চেয়ে দীর্ঘ টেস্ট ক্যারিয়ার আর কেবল দুজনের। ভারতের ব্যাটিং গ্রেট শচীন টেন্ডুলকার ও পাকিস্তানের সাবেক অধিনায়ক ইমরান খান। তার অভিষেকের পর থেকে বাংলাদেশ খেলেছে ১১৯ টেস্ট। এর মধ্যে কেবল ২০টিতে দলে থাকা হয়নি তার। সবচেয়ে বেশি ৪১ ইনিংসে ব্যাটিং করেছেন পাঁচ নম্বরে, রয়েছে ৬ সেঞ্চুরি ও ১ হাফসেঞ্চুরি। এর উপরে চার নম্বরে ব্যাটিংয়ে তাকে দেখা গেছে ১৭ ইনিংসে। সাত আর আটে তিনি ব্যাটিং করেছেন ৪১ ইনিংসে।  

মিস্টার ডিফেন্ডেবলের এই লম্বা সময়ের ক্যারিয়ারের নেপথ্যে রয়েছে অধ্যবসায়, শৃঙ্খলিত জীবন আর খেলার প্রতি নিবেদন। মুশফিকের অনুশীলন দেখেও বিস্মিত হন অনেকে। আয়ারল্যান্ড কোচ এই কদিনেই বাংলাদেশি ব্যাটারের জীবনযাপন দেখে মুগ্ধ। তার চোখের দেখা– সবার আগে বাসে ওঠেন মুশফিক। মাঠে গিয়ে ওয়ার্মআপ, স্ট্রেচিং, ব্যাটিং অনুশীলন– সবই তিনি করে ফেলেন অন্যরা মাঠে পৌঁছানোর আগে। 

পরিপাটি থাকতেও পছন্দ করেন তিনি। ড্রেসিংরুমে ব্যাট রাখেন সোজা করে, জুতো জোড়াও। জায়নামাজও ভাঁজ করে রাখেন সুন্দর করে। তারকা ক্রিকেটারদের নিয়ে কোনো না কোনো সময় বিতর্ক উঠেছে, কিন্তু মুশফিক তা থেকে যোজন যোজন দূরে থাকতেন। সিনিয়র-জুনিয়র ক্রিকেটারদের কাছ থেকে এত সম্মান খুব কম ক্রিকেটারই অর্জন করেছেন। তামিম ইকবাল বলছিলেন, ‘এটা মুশফিকের জন্য বিশাল অর্জন। বাংলাদেশের জন্য একশ টেস্ট খেলার আসল দাবিদার সে। তার পরে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক হওয়া অনেক খেলোয়াড় এরই মধ্যে শতাধিক টেস্ট খেলে অবসর নিয়েছে। তার এই অর্জন দেশের প্রত্যেক ক্রিকেটপ্রেমীর উদযাপন করা উচিত। এই ম্যাচ দিয়ে তাকে কোনোভাবে বিচার করা যাবে না, সে ২০ বা দুইশ যাই করুক না কেন।’

আসলেই তাই, বাংলাদেশে এমন দিন কখনও আসেনি। এই মাইলফলকের ম্যাচে তিনি আলো ছড়াক বা না ছড়াক, শততম টেস্টে মুশফিকই বেস্ট, মানে সেরা।

পাঠকের মন্তব্য