সনি- র্যাংগসের শীর্ষ ৩ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের অভিযোগ, অনুসন্ধানে দুদক
-
- - নিজস্ব -
- প্রতিবেদক --
- ২৪ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
দেশের পরিচিত ইলেকট্রনিক্স ব্র্যান্ড সনি-র্যাংগস-এর শীর্ষস্থানীয় তিন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রায় পনের থেকে বিশ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচারের অভিযোগ উঠেছে। বড় অংকের এ অর্থ পাচারের অভিযোগের ভিত্তিতে দুর্নীতি দমন কমিশন এবার আটঘাট বেঁধে অনুসন্ধানে নেমেছে। সম্প্রতি দুদকের আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালত সনি-র্যাংগস-এর এমডিসহ ৩ জন শীর্ষ কর্মকর্তার বিদেশ যাত্রার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে।
দুদক সূত্র জানায়, যেহেতু সনি-র্যাংগস-এর বিরুদ্ধে কয়েকবারই বড় ধরণের অর্থ পাচারের অভিযোগ উঠেছে, তাই এবার বেশ আটঘাট বেঁধে অনুসন্ধানে নেমেছে দুদক দল। কার্যক্রম খুব দ্রুতই এগুচ্ছে বলে জানা যায়। অনুসন্ধান শেষ হলেই আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগের সত্যতা জানানো হবে এবং আইনী প্রক্রিয়া শুরু হবে বলে সূত্র জানায়।
গত ১৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মহানগর জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ আদালতের বিচারক মো. সাব্বির ফয়েজ, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সনি র্যাংগস (র্যাংগস ইলেকট্রনিকস লিমিটেড)-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) জে একরাম হোসেন, তার বোন ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর (ডিএমডি) বিনাস হোসেন এবং তাদের মা চেয়ারম্যান সাচিমি ওগাওয়ারা হোসেন-এর দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞার এ আদেশ দেন যা তাদের অর্থ পাচারের অভিযোগটি আরও সামনে নিয়ে আসে।
দুদকের আবেদনে উল্লেখ করা হয়, একরাম হোসেন, বিনাস হোসেন ও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে সম্পদ অর্জনের মাধ্যমে আনুমানিক ১৫ থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচারের অভিযোগ রয়েছে। গোপন অনুসন্ধান ও প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, তাদের ও পরিবারের সদস্যদের নামে দেশে-বিদেশে বিপুল পরিমাণ স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ রয়েছে। এছাড়া অভিযোগে বলা হয়, এসব অবৈধ সম্পদ অন্যত্র হস্তান্তর বা স্থানান্তরের চেষ্টা চলছে- এমন তথ্য পাওয়া যাওয়ায় আলামত সংরক্ষণ ও সম্পদ পাচার রোধে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিদেশগমন নিষিদ্ধ করা জরুরি হয়ে পড়ে।
উর্ধ্বতন ৩ জনই বিদেশী পাসপোর্টধারী: অভিযোগ রয়েছে সনি র্যাংগস (র্যাংগস ইলেকট্রনিকস লিমিটেড)-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) জে একরাম হোসেন, ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর (ডিএমডি) বিনাস হোসেন এবং তাদের মা সাচিমি ওগাওয়ারা হোসেন তিনজনই বিদেশি পাসপোর্টধারী। এতে অর্থ পাচারের বিষয়টি আরও ঘনিভুত হয়। দুদকের অভ্যন্তরীন সুত্র জানিয়েছে তারা হয়ত বিদেশি পণ্য আমদানী করার কথা বলে অর্থ পাচার করে এবং দেশি পণ্যকেই ক্রেতার কাছে বিদেশি হিসাবে বলে বেশি মূল্যে বিক্রি করে। তবে অনুসন্ধান শেষ হলেই আসল বিষয়টি পরিস্কার হবে বলে জানায় দুদক কর্তৃপক্ষ। অভিযোগ সত্য হলে পরবর্তী আইনী পদক্ষেপ নেবে দুদক। নাগরিকত্ব ও পাসপোর্ট সম্পর্কে জানার জন্য কয়েকবার ফোনে প্রধান কার্যালয়ে যোগাযোগ করা হলে উচ্চপদস্থ কেউ তো কথা বলেনই নি এবং জনসংযোগ বিভাগেরও কেউ কথা বলতে রাজি হননি বলে অভ্যর্থনা ডেস্ক থেকে জানানো হয়।
দুদকের অনুসন্ধান শুরু ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে: দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে সনি-র্যাংগস ইলেকট্র্রনিক্স লিমিটেড ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধান শুরু করে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক জে. একরাম হোসেন, উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক বিনাস হোসেন এবং পরিচালনা পর্ষদের কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম, সম্পদ গোপন ও অবৈধ আর্থিক কর্মকাণ্ডের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। দুদক প্রধান কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. আলমগীর হোসেনকে টিম লিডার এবং উপ-সহকারী পরিচালক মো. আল আমিনকে সদস্য করে একটি অনুসন্ধান দল গঠন করা হয়। সে সময় দুদকের এক চিঠিতে জানানো হয়, অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য প্রতিষ্ঠানটির নথিপত্র, প্রতিবেদন এবং ব্যাংক লেনদেনের বিস্তারিত তথ্য পর্যালোচনা করা হবে। পরবর্তীতে জানা যায় এমডি একরাম হোসেন ও ডিএমডি বিনাস হোসেনের নামে এবং সনি-র্যাংস ইলেকট্রনিক্স লিমিটেডের সঙ্গে সংশ্লিষ্টভাবে বিপুল অপ্রদর্শিত সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে। পাশাপাশি বিদেশে অবৈধভাবে অর্থ পাচারের অভিযোগও অনুসন্ধানের আওতায় আনা হয়েছে।
২০২১ সালে র্যাংগস ইলেকট্রনিক্সের বিরুদ্ধে প্রতারণার মামলা: ২০২১ সালে বিশ্বাসভঙ্গ ও প্রতারণার অভিযোগে র্যাংগস ইলেকট্রনিক্স লিমিটেড-এর উর্ধ্বতন চার কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন এক ক্রেতা। সে সময় বাদীকে জানানো হয়, বিদেশি ব্র্যান্ডের এসি’র অফার মূল্য প্রায় অর্ধেক। তবে শো-রুমে গিয়ে অফার অকার্যকর জানিয়ে বেশি টাকা নেওয়া হয়। কিন্তু পরে যন্ত্রাংশের সঙ্গে অন্য সাধারণ ব্র্যান্ডের মিল পাওয়ায় নকল পণ্য হিসাবে সন্দেহ হয়। অভিযোগে আরও বলা হয়, ওয়ালটনের যন্ত্রাংশে ‘কেলভিনেটর’ স্টিকার লাগিয়ে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের নামে প্রতারণা করা হয়েছে। তখন ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট শহিদুল ইসলামের আদালত পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)কে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন। প্রায় বছর খানেক পর অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার পর পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) আদালতে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেছে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। এ বিষয়ে র্যাংগস কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে কোন মন্তব্য না করলেও নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তারা দেশি যন্ত্রাংশের মিশ্রনে পণ্য সরবরাহর কথা পরোক্ষভাবে স্বীকার করেছেন। এ নিয়ে অন্যান্য সংবাদ মাধ্যমে খবরও প্রচারিত হয় সেসময়।
এ বিষয়ে সনি-র্যাংগসের প্রধান কার্যালয়ে কয়েকবার ফোনে যোগযোগ করা হলেও কোন কর্মকর্তা কথা বলেননি।