আওয়ামী লীগ নেতাকে অবৈধভাবে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব, মনপুরা ইউএনওকে আদালতের শোকজ

ভোলার মনপুরায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা উপজেলা আওয়ামী লীগের শিক্ষা ও মানবসম্পদ বিষয়ক সম্পাদক মোঃ মাইনউদ্দিনকে অবৈধভাবে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দেওয়ায় মনপুরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবু মুছাকে শোকজ করেছেন আদালত। একই সঙ্গে বিতর্কিত আদেশটি স্থগিত করে বিবাদীদের ৫ দিনের মধ্যে জবাব দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গত ৩০ মার্চ এক অফিস আদেশের মাধ্যমে বেআইনিভাবে মোঃ মাইনউদ্দিনকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দেয়া হয়। মনপুরা সিভিল জজ আদালত, ভোলায় দায়ের করা মামলা নং-১৫/২০২৬ এর নথি বিশ্লেষণে এ তথ্য জানা যায়।

মাইনউদ্দিনের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ রয়েছে। তিনি অবৈধভাবে দলীয় প্রভাব খাটিয়ে বিধি বহির্ভূতভাবে নিয়োগ নিয়েছেন এবং ফলাফল শিটে কাটাকাটি করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। পূর্বের প্রতিষ্ঠানে ধর্ষণের কারণে বরখাস্ত হয়েছিলেন। সহকারী প্রধান হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পরও বিভিন্ন অনিয়মে জড়িয়ে পড়েন তিনি। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর কিছুদিন আত্মগোপনে থেকে বিএনপির এক নেতার প্রভাবে পুনরায় বিদ্যালয়ে ফিরে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষার মহাপরিচালকের তদন্ত চলমান থাকা অবস্থাতেও অবৈধ চিঠির মাধ্যমে তিনি ভারপ্রাপ্তের দায়িত্ব নেন।

মামলার নথি থেকে জানা যায়, তিনি  ২০১৫ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পূর্ববর্তী প্রতিষ্ঠানের তথ্য গোপন করে অনিয়মের মাধ্যমে ছমেদপুর বাংলাবাজার মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিপত্র অনুযায়ী প্রয়োজনীয় যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও তিনি একাধিক তৃতীয় শ্রেণি নিয়ে দলীয় প্রভাব খাটিয়ে বেআইনিভাবে নিয়োগ নেন বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। এছাড়াও, নিয়োগের ফলাফল শিটের নম্বর কাটাছেঁড়া করে তাকে পাস করানো হয়েছে বলে মামলার নথিতে উল্লেখ রয়েছে। নিয়োগের পর থেকেই তিনি বিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট করছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।

বিদ্যালয়ের এডহক কমিটি সূত্রে জানা যায়, গত ৩০ মার্চ ২০২৬ তারিখে ইউএনও আবু মুছা আকস্মিকভাবে বিদ্যালয়ে উপস্থিত হয়ে কমিটির অন্য সদস্যদের অবহিত না করে এবং কোনো রেজুলেশন ছাড়াই এককভাবে সাময়িক বরখাস্তকৃত শিক্ষক মোঃ মাইনউদ্দিনকে স্বপদে বহালের দোহাই দিয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দেওয়ার এ আদেশ জারি করেন। এতে কমিটির সদস্যদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয় এবং তারা আদালতের শরণাপন্ন হন। পরবর্তীতে আদালত ইউএনওকে শোকজ করেন।

এদিকে সরকার পরিবর্তনের পর সহকারী প্রধান শিক্ষক পদে প্রতিদ্বন্দ্বি প্রার্থী আবদুল্লাহ আল নোমান মোঃ মাইনউদ্দিনের নিয়োগ প্রক্রিয়া চ্যালেঞ্জ করে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে আবেদন করেন, যা বর্তমানে জেলা শিক্ষা অফিসার, ভোলা কর্তৃক তদন্তাধীন রয়েছে।

আরও জানা যায়, ৮ এপ্রিল ২০২৫ তারিখে বিদ্যালয়ের বিদায়ী প্রধান শিক্ষকের সংবর্ধনা ও এসএসসি পরীক্ষার্থীদের বিদায় অনুষ্ঠানে অনাকাঙ্ক্ষিত ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। ওই ঘটনায় মোঃ মাইনউদ্দিন প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি উপজেলা নির্বাহী অফিসার লিখন বনিক ওই দিনের বিষয়টি তদন্তে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার ও উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসারকে পৃথক দায়িত্ব দেওয়া হয়। তাদের পৃথক তদন্ত প্রতিবেদনে ওই ঘটনায় তার সম্পৃক্ততার বিষয়টি উঠে আসে। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটি তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে।

এদিকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার এমন কর্মকাণ্ডে অভিভাবক ও স্থানীয় সচেতন মহলের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। তারা মোঃ মাইনউদ্দিনকে ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব ইউএনও মনপুরার অবৈধ লেন-দেনকে মাধ্যম হিসেবে দেখছেন বলে জানান। এ বিষয়ে তারা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের দ্বারস্থ হবেন বলেও জানিয়েছেন।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ আবু মুছাকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।

পাঠকের মন্তব্য