রিভারটেলে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ
বোর্ডের অনুমোদন ছাড়াই অর্থ স্থানান্তর, ব্যক্তিস্বার্থে তহবিল ব্যবহারের দাবি
-
- - নিজস্ব -
- প্রতিবেদক --
- ৪ মার্চ, ২০২৬
প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সাশ্রয়ী মোবাইল সংযোগসহ ডিজিটাল সেবা দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে যাত্রা শুরু করা মোবাইল ভার্চ্যুয়াল নেটওয়ার্ক অপারেটর (এমভিএনও) রিভারটেল হোল্ডিংস অল্প সময়েই সম্ভাবনাময় স্টার্টআপ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিল। কমিউনিটি-ভিত্তিক বিনিয়োগ, ধারাবাহিকভাবে গ্রাহক সংখ্যায় প্রবৃদ্ধি এবং প্রায় ১ কোটি মার্কিন ডলার বার্ষিক পুনরাবৃত্ত রাজস্ব (এআরআর) অর্জনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের আস্থাও অর্জন করে। তবে ব্যবসা সম্প্রসারণের আগেই একক নিয়ন্ত্রণ, স্বেচ্ছাচারী সিদ্ধান্ত ও গুরুতর আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে এখন প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে এবং প্রায় বন্ধ হওয়ার মুখে রয়েছে।
প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ নথি, আর্থিক হিসাব, বিনিয়োগ কাঠামো এবং পরিচালনা পর্ষদের বৈঠকের রেকর্ড বিশ্লেষণে করপোরেট নিয়ন্ত্রণ ও অর্থপ্রবাহে একাধিক অসঙ্গতির তথ্য পাওয়া গেছে। মূল অভিযোগ প্রতিষ্ঠানটির সাবেক প্রধান নির্বাহী রুহিন হোসাইন ও তার ব্যক্তিস্বার্থকে ঘিরে। তার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে আর্থিক অনিয়ম ও বিনিয়োগসংক্রান্ত প্রতারণার অভিযোগে দেওয়ানি মামলাও হয়েছে বলে জানা গেছে।
নথিপত্রে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানের রাজস্ব, গ্রাহক বিলিং, বিনিয়োগ ও নগদ অর্থ ব্যবস্থাপনার বড় অংশ দীর্ঘ সময় বোর্ডের পূর্ণাঙ্গ তদারকির বাইরে ছিল এবং তা এককভাবে সাবেক প্রধান নির্বাহীর নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়েছে। এর ফলে, আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা দুর্বল হয়ে পড়ে। শেয়ারহোল্ডারদের চুক্তি অনুযায়ী বোর্ডের অনুমোদন ছাড়া বড় অঙ্কের ব্যয়, নির্বাহীদের বেতন নির্ধারণ বা নতুন বিনিয়োগ গ্রহণের সুযোগ ছিল না। কিন্তু মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠার কয়েক মাসের মধ্যেই এই শর্তের লঙ্ঘন করা হয়। বোর্ডের অনুমোদন ছাড়াই প্রধান নির্বাহীর বেতন নির্ধারণ, প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব থেকে ব্যক্তিগত হিসাবে অর্থ স্থানান্তর এবং হিসাবরক্ষণে স্বচ্ছতার ক্ষেত্রে কোন কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ার ঘটনা ঘটে। পাশাপাশি, বোর্ড কাঠামো, শেয়ার বণ্টন ও বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনার অভিযোগও উঠেছে।
রিভারটেলের একজন বিনিয়োগকারীর জানান, তিনি কয়েক ধাপে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ হিসেবে প্রদান করলেও তা প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবে জমা না হয়ে ব্যক্তিগত হিসাবে জমা হয়। পরে সেই অর্থ কখনো শেয়ার বিনিয়োগ, কখনো ব্যক্তিগত ঋণ হিসেবে দেখানো হয়েছে বলে। বিনিয়োগকারীরা বলছেন, আর্থিক ও পরিচালনগত নানা অনিয়মের কারণে রিভারটেলের প্রকৃত মালিকানা কাঠামো ও অর্থপ্রবাহ সম্পর্কে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।
শুরুতে লাইসেন্স গ্রহণ, সেবা সম্প্রসারণ এবং গ্রাহক সংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনা থাকলেও আর্থিক অনিয়ম বাড়ার সাথে সাথে প্রতিষ্ঠানের পরিচালন ব্যয়ে চাপ তৈরি হয়। ভেন্ডর ও সরবরাহকারীদের বড় অঙ্কের বকেয়া পরে এবং টেলিকম অপারেটরদের সঙ্গে চুক্তি বাতিল হতে থাকে। এর ফলে আয় দ্রুত কমে যায়, ব্যাংকিং কার্যক্রমে জটিলতা দেখা দেয় এবং কর্মীদের বেতন অনিয়মিত হয়ে পড়ে। অভ্যন্তরীণ আর্থিক নথি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বোর্ড অনুমোদন ছাড়াই প্রধান নির্বাহীর বেতন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা হয়। একই সময়ে, প্রতিষ্ঠানের নামে অতিরিক্ত ঋণ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে, যা বোর্ডকে জানানো হয়নি বলে দাবি শেয়ারহোল্ডারদের। করপোরেট কার্ড ব্যবহার করে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক ব্যয় মেটানোর অভিযোগও নথিতে উঠে এসেছে। গ্রাহকদের থেকে সেবা প্রদান বাবদ প্রাপ্ত অর্থের তুলনায় প্রতিষ্ঠানের হিসাবে কম অর্থ জমা পড়ার বিষয়টিও নিরীক্ষায় উঠে এসেছে। এক পর্যায়ে গ্রাহকের অর্থ ব্যক্তিগত হিসাবে স্থানান্তরের অভিযোগ উঠলেও পরে তা ফেরত দেওয়া হয় বলে নথিতে উল্লেখ আছে।
এক্ষেত্রেও, নিরীক্ষকেরা প্রশ্ন তুলেছেন। প্রতিষ্ঠানের হিসাবে হঠাৎ বড় অঙ্কের অর্থ জমা পড়ে, যা সাবেক প্রধান নির্বাহী নিজের বিনিয়োগ বলে দাবি করেন। তবে, লেনদেনের ধরণ বিশ্লেষণে ধারণা করা হচ্ছে, এ অর্থ গ্রাহক রাজস্ব থেকেই আসা, যা আগে ব্যক্তিগত হিসাবে জমা হয়ে পরে আংশিকভাবে প্রতিষ্ঠানের হিসাবে দেখানো হয়েছে। বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠানের নামে পৃথক কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগও রয়েছে, যা মূল মার্কিন প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন নয়। বেতন তালিকায় এমন ব্যক্তিদের নাম থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে, যারা বাস্তবে প্রতিষ্ঠানের হয়ে কাজ করেননি বলে বিনিয়োগকারীরা দাবি করেছেন।
আরও অভিযোগ রয়েছে, রিভারটেলের অর্থ ব্যবহার করে অন্য একটি ডিজিটাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মের কার্যক্রম চালানো হয়েছে। দেওয়ানি অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, আর্থিক সংকটের মধ্যেও ওই প্রতিষ্ঠানের অফিস ভাড়া ও কর্মীদের বেতন রিভারটেলের তহবিল থেকে পরিশোধ করা হয়, অথচ এ বিষয়ে বিনিয়োগকারীদের কিছুই জানানো হয়নি। এতে করপোরেট স্বার্থের সংঘাত এবং প্রতিষ্ঠানের সম্পদের অপব্যবহারের প্রশ্ন উঠেছে।
বোর্ড সদস্যদের অভ্যন্তরীণ বার্তা ও ই-মেইলে প্রধান নির্বাহীর আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। একাধিক বৈঠকে বিষয়টি আলোচনা হয় এবং তৃতীয় পক্ষের নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান নিয়োগ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে, রুহিন হোসাইনকে প্রধান নির্বাহীর পদ থেকে অপসারণ করা হয় বলে জানা গেছে।
প্রাথমিক নথি ও আর্থিক তথ্য বিশ্লেষণে বিনিয়োগসংক্রান্ত তথ্য ভ্রান্তভাবে উপস্থাপন, বোর্ড অনুমোদন ছাড়া ঋণ গ্রহণ ও বেতন নির্ধারণ, করপোরেট তহবিলের অপব্যবহার এবং ব্যক্তিস্বার্থে প্রতিষ্ঠানের সম্পদ ব্যবহারের অভিযোগ উঠে এসেছে। নথিতে বর্ণিত অর্থপ্রবাহ, বোর্ড রেকর্ড ও নিরীক্ষা পর্যবেক্ষণে করপোরেট সুশাসনে বড় ধরনের অনিয়মের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তবে, এসব অভিযোগ এখনো আদালতে প্রমাণিত হয়নি। সংশ্লিষ্টদের মতে, অভিযোগগুলো সত্য প্রমাণিত হলে তা দেওয়ানি দায়ের পাশাপাশি সম্ভাব্য ফৌজদারি জটিলতা তৈরি করতে পারে।
রিভারটেলে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে প্রবাসী বিনিয়োগনির্ভর স্টার্টআপগুলোর করপোরেট সুশাসন ও পরিচালনগত স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, একক ব্যক্তির হাতে প্রতিষ্ঠানের রাজস্ব, বিলিং ও বিনিয়োগ নিয়ন্ত্রণ থাকলে তা সার্বিকভাবে বিনিয়োগকারীসহ প্রতিষ্ঠানের অন্যান্য অংশীজনদের জন্যও ঝুঁকি বাড়ায়। নিয়মিত বোর্ড তদারকি, নিরীক্ষা এবং পৃথক হিসাব ব্যবস্থাপনা না থাকলে এ ধরনের অনিয়মের আশঙ্কা থেকে যায়।