বিএম ডিপো থেকে ফেরদৌস শিপইয়ার্ড, বিচার কি কেউ পাবে না?

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে একের পর এক ঘটছে শিল্প দুর্ঘটনা। এসব দুর্ঘটনায় অনেক মানুষের প্রাণহানি ঘটছে। কখনো রাসায়নিকভর্তি কনটেইনারে আগুন, কখনো অক্সিজেন প্ল্যান্টে বিস্ফোরণ, আর কখনো পুরোনো জাহাজের বিষাক্ত গ্যাসে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে শ্রমিকের মৃত্যু। প্রতিটি বড় দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি হয়, নিরাপত্তা নিয়ে নানা আশ্বাস আসে, ক্ষতিপূরণ ঘোষণা করা হয়; কিন্তু কিছুদিন পর সব আগের মতো হয়ে যায়। ফলে সীতাকুণ্ডের শিল্পকারখানা ও শিপইয়ার্ডগুলো শ্রমিকদের জন্য মৃত্যুফাঁদে পরিণত হচ্ছে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) এক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত ৫ বছরে জাহাজভাঙা শিল্পে দুর্ঘটনায় ৫০ জন শ্রমিক মারা গেছেন। সবশেষ শুক্রবার (১৪ আগস্ট) ভাটিয়ারীর ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডে ৯ শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনায় চলতি বছরে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২ জনে।

এদিকে, ফেরদৌস শিপইয়ার্ডে নিহত ৯ শ্রমিকদের মধ্যে ৮ জনের মরদেহ হস্তান্তর করা হয়েছে ময়নাতদন্ত ছাড়া। মামলা কিংবা বিচারিক প্রক্রিয়ার জন্য ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন হলো গুরুত্বপূর্ণ দলিল। ময়নাতদন্ত ছাড়া মরদেহ হস্তান্তরের মধ্য দিয়ে সেই পুরোনো প্রশ্নই সামনে এসেছে—এবারও কি প্রাণহানির ঘটনায় কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে না?

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ নির্ধারণে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাগত তথ্য না থাকলে পরবর্তী সময়ে তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ায় সমস্যা হতে পারে।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আসাদুজ্জামান খান বলেন, ফৌজদারি কার্যবিধির ১৭৪ ধারায় অস্বাভাবিক ও দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর ঘটনায় পুলিশকে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করতে হয় এবং ময়নাতদন্তের ব্যবস্থা করতে হয়। এ ধরনের ঘটনায় মৃত্যুর কারণ নির্ধারণের জন্য ময়নাতদন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে কাজ করে। অবহেলাজনিত মৃত্যুর অভিযোগে মামলা হলে মৃত্যুর চিকিৎসাগত কারণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ময়নাতদন্ত না থাকলে মৃত্যুর কারণ নিয়ে পরবর্তী সময়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তাই প্রতিটি মৃত্যুর ক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করা উচিত ছিল।

২০২২ সালের ৪ জুন রাতে সীতাকুণ্ডের বিএম কনটেইনার ডিপোতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ও বিস্ফোরণে অর্ধশতাধিক মানুষের মৃত্যু হয় এবং দুই শতাধিক মানুষ আহত হন। আগুনের পর একের পর এক বিস্ফোরণে পুরো এলাকা কেঁপে ওঠে। ডিপোতে থাকা রাসায়নিকের কারণে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতেও দীর্ঘ সময় লেগেছিল।

বিএম ডিপোর সেই ভয়াবহতার রেশ কাটতে না কাটতেই পরের বছর ২০২৩ সালের ৪ মার্চ একই সীতাকুণ্ডের কদমরসুল এলাকায় সীমা অক্সিজেন প্ল্যান্টে ঘটে ভয়াবহ বিস্ফোরণ। ওইদিন অক্সিজেন রিফুয়েলিংয়ের সময় বিস্ফোরণে প্রথমে ছয়জনের মৃত্যু হয়। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আরও একজন মারা গেলে নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় সাতজনে। আহত হন অন্তত ২৪ জন। বিস্ফোরণের তীব্রতায় কারখানার অবকাঠামো ও আশপাশের স্থাপনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

সীমা অক্সিজেনের বিস্ফোরণের পর বিশেষজ্ঞরা সম্ভাব্য কয়েকটি কারণের কথা বলেছিলেন। তাদের মতে, অক্সিজেন সিলিন্ডারে গ্যাস ভরার পাইপে ফাটল বা ছিদ্র, গ্যাস নিয়ন্ত্রণের ভালভে ত্রুটি এবং সিলিন্ডারের ভেতরে ত্রুটি—এসবের কোনো একটি বা একাধিক কারণে বিস্ফোরণ ঘটে থাকতে পারে। একইসঙ্গে কারখানার নিরাপত্তা ও তদারকি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল।

বিএম কনটেইনার ডিপোর ভয়াবহ দুর্ঘটনার পর নিরাপত্তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছিল। গঠিত তদন্ত কমিটিও নানা প্রশ্ন সামনে এনেছিল। ঘটনার তিন দিন পর সীতাকুণ্ড থানায় আট কর্মকর্তা-কর্মচারীকে আসামি করে মামলা করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ আনা হয়েছিল। পরে মামলাটি জেলা গোয়েন্দা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

কিন্তু দীর্ঘ তদন্তের পর ২০২৩ সালের মে মাসে পুলিশ জানায়, বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ডিপো কর্তৃপক্ষের কারও সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি। পুলিশ ঘটনাটিকে দুর্ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়। এতে করে কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যায়নি। ফলে ৫১ জনের প্রাণহানির ঘটনায় দায় নির্ধারণ নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

এ কারণেই এবার ফেরদৌস স্টিলের দুর্ঘটনার পর স্থানীয় শ্রমিক ও স্বজনদের মধ্যে পুরোনো ক্ষোভ নতুন করে সামনে এসেছে। তাদের প্রশ্ন, এত প্রাণহানির পরও কেন ঝুঁকিপূর্ণ শিল্পকারখানায় নিরাপত্তাবিধি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে না?

বিএম ডিপো, সীমা অক্সিজেন প্ল্যান্ট এবং সর্বশেষ ফেরদৌস স্টিল—তিনটি দুর্ঘটনার ধরন আলাদা হলেও একটি জায়গায় মিল রয়েছে। তিন ক্ষেত্রেই উঠে এসেছে শিল্পকারখানার নিরাপত্তাব্যবস্থা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, তদারকি ও সংশ্লিষ্টদের দায়িত্ব পালনে অবহেলার বিষয়টি। সীমা অক্সিজেন বিস্ফোরণের পরও প্রশ্ন উঠেছিল, এত ঝুঁকিপূর্ণ কারখানায় পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছিল কি না। বিস্ফোরণে লোহার টুকরা কয়েকশ মিটার দূরে ছিটকে পড়েছিল। আশপাশের ভবনের কাচ ভেঙে যায় এবং স্থাপনায় ফাটল দেখা দেয়।

আর এবার ফেরদৌস স্টিলে অভিযোগ উঠেছে, পুরোনো এলএনজি জাহাজের বদ্ধ অংশে শ্রমিকদের প্রবেশের আগে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়নি। গ্যাস পরীক্ষা, সুরক্ষা সরঞ্জাম, বায়ু চলাচল এবং জরুরি উদ্ধারব্যবস্থা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়, দুর্ঘটনার মাত্র এক মাস আগে নিরাপত্তা ত্রুটির অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে শ্রম আদালতে মামলা করেছিল কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর।

তাহলে প্রশ্ন উঠছে, একটি প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা ঘাটতি শনাক্ত হওয়ার পরও যদি সেখানে কাজ চলতে থাকে এবং শেষ পর্যন্ত নয়জন শ্রমিকের প্রাণ যায়, তাহলে তদারকি ব্যবস্থা আসলে কতটা কার্যকর?

শনিবার (১৫ আগস্ট) ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে বিস্ফোরক অধিদপ্তর চট্টগ্রামের সহকারী বিস্ফোরক পরিদর্শক এসএম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, জাহাজের ভেতরে মাত্রাতিরিক্ত হাইড্রোজেন সালফাইডের উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়েছে। আমরা ধারণা করছি, ঘটনার মূল কারণ হাইড্রোজেন সালফাইডের বিষাক্ততা। আমাদের সমন্বিত কমিটির মাধ্যমে সিদ্ধান্ত হয়েছে, জাহাজ থেকে হাইড্রোজেন সালফাইড অপসারণ করা হবে।

ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কোনো বদ্ধ ও গভীর স্থানে শ্রমিকদের পাঠানোর আগে সেখানে বিষাক্ত বা দাহ্য গ্যাসের উপস্থিতি পরীক্ষা করা জরুরি। প্রয়োজন অনুযায়ী শ্বাস-প্রশ্বাসের সুরক্ষা সরঞ্জামও ব্যবহার করতে হয়। দুর্ঘটনার সময় এসব নিরাপত্তাব্যবস্থা যথাযথভাবে নেওয়া হয়েছিল কি না, তা তদন্তে উঠে আসবে।

প্রতিটি বড় দুর্ঘটনার পর নিহতদের পরিবারের জন্য আর্থিক সহায়তার ঘোষণা আসে। আহতদের চিকিৎসার আশ্বাস দেওয়া হয়। তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কিন্তু দুর্ঘটনার মূল কারণ চিহ্নিত করে তা স্থায়ীভাবে বন্ধ করার ব্যবস্থা কতটা নেওয়া হয়, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

বিএম ডিপোর ঘটনায় ৫১ জনের মৃত্যু এবং শত শত মানুষের আহত হওয়ার পরও দায় নির্ধারণের প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত বিতর্কের মধ্যেই থেকে গেছে। সীমা অক্সিজেন প্ল্যান্টে সাতজনের মৃত্যু সেই ধারাবাহিকতার আরেকটি ভয়াবহ অধ্যায়। আর তিন বছর পর ফেরদৌস স্টিলের ঘটনায় নয় শ্রমিকের মৃত্যু দেখিয়ে দিল, সীতাকুণ্ডের শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক নিরাপত্তার সংকট এখনো কাটেনি।

শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদ সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক ইফতেখার কামাল খান ঢাকা পোস্টকে বলেন, শিল্পকারখানার মালিকদের কাছে উৎপাদন ও ব্যবসার স্বার্থ যতটা গুরুত্বপূর্ণ, শ্রমিকের নিরাপত্তা ততটা গুরুত্ব পায় না। ফলে নিরাপত্তাবিধি কাগজে থাকলেও বাস্তবে তা অনেক ক্ষেত্রে উপেক্ষিত থাকে। ফেরদৌস স্টিলের ঘটনায় এখন লোক-দেখানো তদন্ত হবে। দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হবে। কিন্তু আদতে কী হবে জানি না।

তিনি আরও বলেন, প্রতিটি ঘটনাগুলো যেন একই সতর্কবার্তা দিচ্ছে। সীতাকুণ্ডে ভারী শিল্পের বিস্তার হয়েছে, কিন্তু সেই শিল্পের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শ্রমিকের জীবন সুরক্ষার ব্যবস্থা কতটা এগিয়েছে, তার উত্তর এখনো মেলেনি।

আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী অ্যাডভোকেট জিয়া হাবীব ঢাকা পোস্টকে  বলেন, সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল সংস্থাগুলোর—যেমন পরিবেশ অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিসসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর—যথাযথ তদারকি নেই। ফলে এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটছে। কিন্তু এসব ঘটনারও যথাযথ বিচার হচ্ছে না।

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) চট্টগ্রাম বিভাগীয় সমন্বয়ক মনিরা পারভীন ঢাকা পোস্টকে বলেন, দেশে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে যেসব মামলা হয়, সেসব মামলারও দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। বিচারও দৃশ্যমান নয়। রাষ্ট্রের উচিত, এসব অপরাধের ঘটনায় কঠোর আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিচার নিশ্চিত করা।

পাঠকের মন্তব্য