আল্লাহর হুকুমেই শেখ হাসিনার বিদায় হয়েছে
-
- - নিজস্ব -
- প্রতিবেদক --
- ১৪ মে, ২০২৬
জাতীয় প্রেসক্লাবের আবদুস সালাম হলে জামায়াত নেতা মিয়া গোলাম পরওয়ারের পাঁচটি বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে পানিসম্পদ মন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি তার দীর্ঘ জেল জীবনের স্মৃতি রোমন্থন করেছেন।
বুধবার (১৩ মে) বিকেলে এই অনুষ্ঠানে তিনি কারাগারে বিরোধী রাজনীতিকদের সঙ্গে কাটানো সময়ের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন এবং ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনকে ‘আল্লাহর হুকুম’ বলে অভিহিত করেন।
অনুষ্ঠানে সাবেক এই ছাত্রনেতা বিগত নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নিজের কারাজীবনের বর্ণনা দিতে গিয়ে তৎকালীন শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে কাটানো মুহূর্তগুলোর স্মৃতিচারণ করেন। তিনি বলেন, ফ্রাঙ্কেস্টাইন পদ্ধতিতে দেশ শাসন করা ভয়ঙ্কর শাসক হাসিনার হাত থেকে রক্ষা পাওয়া ছিল সম্পূর্ণ আল্লাহর হুকুম।
উপস্থিত জামায়াত নেতাদের উদ্দেশ্যে বিএনপির এই যুগ্ম মহাসচিব বলেন, পার্লামেন্ট ও বাইরে আপনাদের মধ্যে পার্থক্য আছে। প্রকৃতপক্ষে এই পার্থক্যটা থাকা উচিত না। আমরা সবাই মিলেমিশে পার্লামেন্টে যেভাবে কথা বলি, সেভাবেই যেন বাইরে মিলেমিশে চলতে পারি।
এ্যানি বলেন, আমাদের মজলুম নেতাদের একজন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। যার সঙ্গে কারাগারে আমার দীর্ঘদিনের আড্ডা, গল্প, খাওয়া-দাওয়া, নামাজ- সবকিছু মিলে কারাজীবন অতিবাহিত হয়েছে। উনার নিজের হাতে লেখা পাঁচটি বইয়ের মোড়ক উন্মোচন এবং এই উন্মোচন উপলক্ষ্যে আজকে যে বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে, আমি উনার দাওয়াত পাওয়া মাত্রই জেল জীবনের অংশীদার হওয়ার জন্য দু-চারটি কথা বলার সুযোগ পেয়েছি।
পানিসম্পদ মন্ত্রী বলেন, আমি সবসময় তো রাজনীতি নিয়ে খুব ব্যস্ত থাকি। ছাত্রজীবন থেকেই যখন হাসিনা বিরোধী আন্দোলন ছিল, তখন একদিকে পালিয়ে থাকতাম, আরেকদিকে পালানো অবস্থায়ও প্রোগ্রাম অর্গানাইজ করতাম। ওই ব্যস্ততার মধ্য দিয়েই জীবনটা চলেছে। এখনো একইভাবে ব্যস্ততা। আমি কখনো একটা বই লেখার সুযোগ পাই নাই। কতবার জেলে গিয়েছি, কতবার ডায়েরিতে পরওয়ার ভাইয়ের মতো নোট করেছি। উনার (গোলাম পরওয়ার) যেরকম লেখা হয়েছে, আমার তেমন লেখা হয় নাই।
শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি বলেন, এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের সময়ই আমি একবার জেলে গিয়েছি। হাসিনার আমলে গিয়েছি। আমার আনুমানিক ধারণা ১২-১৩ বার হবে। সর্বশেষ জুলাই আন্দোলনে ২৫ জুলাই আমি গ্রেপ্তার হয়েছি, ৩৬ জুলাই (৫ আগস্ট) আমি বের হয়েছি। ১ আগস্ট আমি ছয় মাসের জন্য বাজার করেছি আমি এবং ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থসহ। সিদ্ধান্ত নিয়ে পিসির টাকা দিয়ে ইলেকট্রিক চুলা পর্যন্ত কিনেছি। সবকিছু কিনে রেডি; কারণ ১ আগস্টও মনে হয় নাই যে আমরা সবাই মিলে আন্দোলন করে এই যে ফ্রাঙ্কেস্টাইন পদ্ধতিতে যিনি দেশ শাসন করেছিলেন, সেই ভয়ঙ্কর শাসক হাসিনার হাত থেকে রক্ষা পাব। এটা সম্পূর্ণ আল্লাহর হুকুম।
এ্যানি বলেন, ৫ তারিখে যখন রেডিওতে শুনলাম যে হাসিনা উড়াল দিয়েছে, পালিয়ে গেছে; তখন আমরা একজনে আরেকজনকে আলিঙ্গন করলাম চোখের পানি দিয়ে।
সাবেক এই ছাত্রনেতা বলেন, ৫ তারিখ ভোরবেলায় আমরা কয়েকজন মিলে কথা বললাম যে এতো বৃষ্টি! বৃষ্টির মধ্যে সবাই কি আসলে জড়ো হতে পারবে? ঠিক ১০টা-পৌনে ১১টায় যখন রোদ দেখলাম, আমরা জেলখানায় বসে একটু আশার আলো পেলাম যে না। আমার ছাত্র ভাইয়েরা, দেশবাসী সবাই একত্রিত হবে। আজকে না হোক, যেকোনো সময় হাসিনার বিদায় হতেই হবে। কারণ সবাই ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে।
তিনি বলেন, প্রতিদিন যেভাবে লাশের পর লাশ, খুনের পর খুন। আমি ৪ আগস্ট জেলখানা থেকে চুরি করে টেলিফোন করেছি যে কী হলো লক্ষ্মীপুরে। খবর পেলাম একই দিনে ১৩ জনের মৃত্যু। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে যারা আন্দোলনে ছিল তাদের ৮ জন এবং এর পরবর্তীতে ওই যে গডফাদার তাহের, তার বাড়ি ঘেরাও দিয়ে চারপাশে জনতা আগুন লাগিয়ে দিল; ওই আগুনের মধ্যে পড়ে মারা গেল ৬-৭ জন। এই ছিল লক্ষ্মীপুরের চিত্র। এইভাবে তো ২৫, ২৬, ২৭ তারিখ কন্টিনিউ মৃত্যুর মিছিল। আমি এই কারণে বলি যে আল্লাহর হুকুম ছাড়া শেখ হাসিনার বিদায় হয় নাই। আমরা তো উসিলা, আমরা আন্দোলন করেছি।
জামায়াত নেতাদের সঙ্গে দীর্ঘ সময় জেল জীবনের স্মৃতি রোমন্থন করে এ্যানি বলেন, দীর্ঘ ১৭-১৮ বছর আন্দোলন করতে গিয়ে অনেকবার জেলে গেছি। একবার ব্যারিস্টার আরমানের পিতা মীর কাসেম সাহেবের সঙ্গে দেখা হলো গাজীপুর কাশিমপুর কারাগারে। তিনি বললেন, তোমার সুরমাতে এতো কাঁঠাল, তুমি আমার এখানে কাঁঠাল পাঠাও না! একা একা খাও! আমি বললাম, দেখেন আমি কাঁঠাল খুব একটা বেশি খাই না, আম পাইলে বেশি খাই। তিনি বললেন, আমি তোমার জন্য আম পাঠাব, তুমি আমার জন্য কাঁঠাল পাঠাবা। আমি উনার সঙ্গে দেখা হওয়ার পর ৩-৪টি কাঁঠাল প্রতিদিন কেটে কেটে পাঠিয়ে দিতাম। তিনি কাঁঠাল খুব পছন্দ করতেন।
আমি ২৬ সেলে ছিলাম এই ওয়ান ইলেভেনের সময়। যেখানে আজকের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তখন জেলে। তখন উনার সঙ্গে দেখা করা আমাদের জন্য কঠিন ছিল। দেখা করতে দিত না। লুকিয়ে আমরা দেখা করতাম, তার পাশে যাওয়ার চেষ্টা করতাম। তার ওপর অত্যাচার-নির্যাতনের কাহিনী তো নতুন করে বলার প্রয়োজন নেই। এখনো তিনি কিন্তু ওই অত্যাচার-নির্যাতনের চিহ্ন নিয়ে চলছেন।
এ্যানি স্মৃতিচারণ করে বলেন, একদিন ওই ২৬ সেলে আমার সব সিনিয়র, ব্যারিস্টার মওদুদ সাহেব, কর্নেল ওলি সাহেব, মির্জা আব্বাস সাহেব, সাঈদী সাহেব, মতিউর রহমান নিজামী সাহেব। তারপরে আব্দুল কাদের মোল্লা সাহেব, কামারুজ্জামান ও মুজাহিদ সাহেব ছিলেন। আমাকে বলা হলো আজকে তোমাকে একটা ভালো খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন করতে হবে। আমি চিন্তা করলাম এতো লোক! পিন্টু সাহেব, আব্দুস সালাম, সবাই আমাকে দায়িত্ব দিলেন। আমি জেলখানায় টাকা দিয়ে ১০টি তাজা মুরগি নিয়ে আসলাম। আনার পর দেখলাম যে এগুলো যদি আমি আগের দিন জবাই করি তবে বাসি হয়ে যাবে। তাই ওদিন সকালেই জবাইয়ের ব্যবস্থা করলাম। একটা মুরগি রাখার খোয়ার বানানোর চেষ্টা করলাম। নরসিংদীর বাবুর্চি শাহজাহানকে দিয়ে সব ব্যবস্থা করলাম। আইটেম সব রেডি করলাম। ওদিন খাওয়া-দাওয়া হলো। পরদিন আমার মুক্তি। সেদিনই একেকজনের একেক জায়গায় ট্রান্সফার হয়ে গেল শুধু ওই খানাদানার আয়োজনের কারণে। পরের দিন আমাকে বের করে দেওয়া হলো। শুধু জেলে রয়ে গেলেন ব্যারিস্টার মওদুদ ও সাঈদী সাহেব।
জেল জীবনের স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে তিনি বলেন, সাঈদী সাহেবের সঙ্গে আমার মিল ছিল খুব ভালো। আমি উনার ভক্ত ছিলাম। উনার বেয়াইয়ের বাড়ি ছিল লক্ষ্মীপুরে। সেখানে তাফসিরে এলেই আমাকে দাওয়াত দিতেন।
কাদের মোল্লা ব্যতিক্রমী মানুষ ছিলেন উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, সুরমাতে থাকাকালীন উনি বলতেন আজকে কই মাছ খাওয়ার কম্পিটিশন হবে। উনি কই মাছ খেতেন কিন্তু একটা কাঁটা পর্যন্ত ফেলতেন না। মাথা থেকে লেজ পর্যন্ত ফেলে দেওয়ার মতো কিছু থাকত না। পাশের সেলে ছিলেন এ টি এম আজহারুল ইসলাম। দেখা হওয়ার সুযোগ ছিল না, তবে খোঁজ নিতাম।
গোলাম পরওয়ারের সঙ্গে জেল জীবনের স্মৃতি রোমন্থন করে বিএনপির কেন্দ্রীয় এই নেতা বলেন, আমি জেলে যাওয়ার খবরে কাশিমপুর কারাগারে উনি এসে উপস্থিত হলেন। উনি ব্রেকফাস্টের দাওয়াত দিলেন। ওখানকার ইমাম ছিলেন আজকের জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান। উনি নামাজে ইমামতি করতেন। কয়েকজন নামাজ পড়তেন না, উনি বিভিন্ন মাসয়ালা দিতেন, আমিও উদ্বুদ্ধ করতাম। সবকিছু মিলে জেল জীবন ও অত্যাচার-নির্যাতনের কাহিনী যদি বলতে থাকি, তবে বই হয়ে যাবে।
সাবেক এই ছাত্রনেতা বলেন, ১৯৮০ সাল থেকে সরাসরি ছাত্র রাজনীতিতে আছি। প্রেসিডেন্ট জিয়ার হাত ধরে খাল কাটা কর্মসূচি থেকে। আমি চেষ্টা করি তার আদর্শকে ধারণ করার। তার রাজনৈতিক দর্শন আমাকে উদ্বুদ্ধ করেছিল বলেই বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে আমার উত্থান। এখনো অনেকে বলেন আপনাকে তো ছাত্রের মতোই লাগে, বয়স নাকি বেশি হয় নাই।
মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন, জামায়াতের নায়েবে আমির মজলুম এ টি এম আজহারুল ইসলাম। উপস্থিত ছিলেন বইগুলোর লেখক জামায়াত সেক্রেটারি মিয়া গোলাম পরওয়ার, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আমির নূরুল ইসলাম বুলবুল, ঢাকা মহানগর উত্তরের আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন, নারায়ণগঞ্জ মহানগর আমির আব্দুল জব্বার, হাফেজ রাশেদুল ইসলাম এমপি, ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম সাদ্দাম, ব্যারিস্টার আহমদ বিন কাসেম আরমান, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি ও দৈনিক মানবকণ্ঠ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম।
গোলাম পরওয়ারের প্রকাশিত বইগুলো হলো
লৌহকপাটের অন্যজীবন, মুমিনের জীবনে নিয়ামত ও মুসিবত, কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, ঈমানের উন্নতি, মুমিনের শ্রেষ্ঠ হাতিয়ার সালাত ও সবর।