আল আরাফাহ ব্যাংকের আউটলেট থেকে কোটি টাকা উধাও
-
- - নিজস্ব -
- প্রতিবেদক --
- ১৯ অগাস্ট, ২০২৬
কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার পালংখালীতে আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের একটি আউটলেট এজেন্ট শাখার ম্যানেজার ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ২১ জনগ্রাহকের জমা করা ১ কোটি ৪২ লাখ ৫৭ হাজার ৯৪৪ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় আউটলেটটির এজেন্ট মালিকসহ দুজনকে আটক করেছে উখিয়া পুলিশ।
সর্বশেষ বুধবার (১৯ আগস্ট) দুপুরে তাদের আদালতে পাঠানো হয়েছে বলে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
গ্রেপ্তাররা হলেন- এজেন্ট মালিক হাকিম উদ্দিন (৬৮) এবং ক্যাশিয়ার তাহসিন ইসলাম।
এর আগে মঙ্গলবার দিবাগত রাতে পালংখালী বাজারের ব্যবসায়ী আনোয়ার ফয়সাল আরিফ বাদী হয়ে উখিয়া থানায় একটি এজাহার দায়ের করেছেন। এজাহারে আউটলেটটির এজেন্ট মালিক হাকিম উদ্দিন (৬৮), ক্যাশিয়ার তাহসিন ইসলাম (২১), ম্যানেজার হাবিব উল্লাহ ফরহাদ (৩২), অংশীদার মালিক বেলাল উদ্দিন (৫২), মো. ইউছুপ (৩১), মো. ইছহাক (৩২), মো. আব্দুল্লাহ (৩৩), ইফতেকার উদ্দিন (৩৫) ও জহির উদ্দিনসহ (৪২) অজ্ঞাতনামা আরও ৫-৬ জনকে আসামি করা হয়েছে।
থানায় দায়ের করা এজাহার সূত্রে জানা যায়, ২০১৮ সালের দিকে উখিয়া উপজেলার পালংখালী বাজারের ইয়াকুব-মোস্তফা মার্কেটের দ্বিতীয় তলায় আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের আউটলেট এজেন্ট হিসেবে শাখাটির কার্যক্রম শুরু হয়। অভিযুক্তদের সঙ্গে স্থানীয় গ্রাহকদের পূর্বপরিচয় থাকায় তারা সরল বিশ্বাসে ওই আউটলেটে হিসাব খুলে নিয়মিত টাকা জমা রাখা ও লেনদেন করতেন।
মামলার বাদী আনোয়ার ফয়সাল আরিফের দাবি, তার নিজের হিসাবেই ৫ লাখ ৫৫ হাজার টাকা জমা ছিল। এছাড়া এজাহারে উল্লেখ করা ২১ জন গ্রাহকের হিসাবে বিভিন্ন পরিমাণ অর্থ জমা ছিল। এসব হিসাবে জমা থাকা অর্থের মোট পরিমাণ ১ কোটি ৪২ লাখ ৫৭ হাজার ৯৪৪ টাকা বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
এজাহারে দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, আমিরুল ফয়েজের ৩ লাখ ৮৫ হাজার টাকা, তামজিদ ফয়েজের ১০ লাখ ৫২ হাজার টাকা, রেহেনা আক্তারের ৫ লাখ টাকা, মর্জিনা বেগমের ১৪ লাখ টাকা, আনোয়ার হোসেনের ৮০ হাজার ৯৫০ টাকা, মো. ইউছুপের ১ লাখ ৫২ হাজার টাকা, মো. ইউনুছের ১০ লাখ ৩৪ হাজার টাকা, নুরুল বশরের ৫ লাখ ২৯ হাজার টাকা, খতিজাতুল কোবরার ১০ লাখ টাকা, ফাতেমা বেগমের ৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা, খাইরুল বশরের ৪ লাখ ৬০ হাজার টাকা, রফিক উদ্দিনের ৭৪ হাজার টাকা, আনোয়ারা বেগমের ৮ লাখ ৪ হাজার ৩১৫ টাকা, মো. সোহেলের ৩ লাখ ৫৫ হাজার ৩০৮ টাকা, কাদের হোসেনের ২২ লাখ ২০ হাজার টাকা, নুর নাহার বেগমের ৫৮ হাজার ৫০০ টাকা, রহিমা খাতুনের ৫ লাখ ১ হাজার ৫০০ টাকা, ছৈয়দ আলমের ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা, মো. শাহজাহানের ৯ লাখ টাকা, শফিকুর রহমানের ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং রুনা আক্তারের ৫ লাখ ৩৫ হাজার ২৭১ টাকা জমা ছিল।
ব্যাংকটির গ্রাহক আমিরুল ফয়েজ বলেন, ‘আমি দীর্ঘদিন ধরে ওই আউটলেটে টাকা জমা করে আসছি। প্রয়োজনের সময় টাকা তুলতে গেলে নানা অজুহাতে আমাকে টাকা দেওয়া হয়নি। পরে হিসাব ও জমার রসিদ যাচাই করে দেখি, আমার জমা করা টাকার সঙ্গে হিসাবে থাকা টাকার মিল নেই। এতে আমরা গ্রাহকেরা চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছি। আমাদের কষ্টার্জিত টাকা দ্রুত ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা চাই।’
অন্য একগ্রাহক রুনা আক্তার বলেন, ‘বিশ্বাস করে ব্যাংকের ওই আউটলেটে টাকা জমা রেখেছিলাম। প্রয়োজনের সময় টাকা তুলতে গিয়ে জানতে পারি, আমার হিসাবে জমা করা টাকার পুরোটা নেই। আমরা বারবার যোগাযোগ করেও সন্তোষজনক কোনো সমাধান পাইনি। এখন আমাদের দাবি, সঠিক হিসাব যাচাই করে প্রত্যেক গ্রাহকের জমা করা টাকা ফেরত দেওয়া হোক।’
আরেক গ্রাহক খতিজাতুল কোবরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমি ওই আউটলেটে ১০ লাখ টাকা জমা রেখেছিলাম। কিন্তু টাকা প্রয়োজন হলে তা তুলতে গিয়ে সমস্যায় পড়ি। পরে জানতে পারি, আমাদের মতো আরও অনেক গ্রাহকের টাকাও আটকে আছে। আমরা আমাদের জমা করা টাকা ফেরত চাই এবং এ ঘটনায় যারা জড়িত, তদন্ত করে তাঁদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।’
বাদীর অভিযোগ, কিছুদিন ধরে তিনি ও অন্যান্য গ্রাহকসহ নিজেদের প্রয়োজনের জন্য টাকা তুলতে গেলে অভিযুক্তরা নানা অজুহাতে টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানান। পরে হিসাব পর্যালোচনা করে তারা দেখতে পান, জমা করা অর্থের বড় অংশ হিসাব থেকে নেই। কোনো কোনো হিসাবে মাত্র ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা দেখানো হচ্ছিল বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
এজাহারে আরও অভিযোগ করা হয়, বিষয়টি জানতে অভিযুক্তদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা জমা করা টাকা ফেরত দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে সময়ক্ষেপণ করতে থাকেন। পরে গ্রাহকেরা তাদের জমার রসিদ ও হিসাব পর্যালোচনা করে অভিযোগ করেন, ব্যাংকের মালিক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা পরস্পর যোগসাজশে হিসাবের বই, জমা রসিদ ও সংশ্লিষ্ট নথিতে জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে মিথ্যা এন্ট্রি তৈরি করে গ্রাহকদের টাকা ব্যাংকে জমা না দিয়ে অন্য হিসাবগুলোতে স্থানান্তর করেছেন।
বাদী আনোয়ার ফয়াল আরিফের ভাষ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) সকাল ১১টার দিকে তিনি ও সাক্ষীরা আউটলেট কার্যালয়ে গিয়ে তাদের জমা রাখা মোট ১ কোটি ৪২ লাখ ৫৭ হাজার ৯৪৪ টাকা ফেরত চান। এ সময় অভিযুক্তরা টাকা দিতে পারবেন না বলে তাঁদের সঙ্গে তর্কে জড়ান। একপর্যায়ে বাদী ও সাক্ষীরা হাকিম উদ্দিন ও তাহসিন ইসলামকে আটক করেন। তখন অপর অভিযুক্তরা কৌশলে কার্যালয় থেকে বের হয়ে পালিয়ে যান।
পরে স্থানীয় লোকজন জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে ফোন করলে উখিয়া থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে আটক দুজনকে হেফাজতে নেয়। পুলিশ তাদের উখিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করে। কর্তব্যরত চিকিৎসক হাকিম উদ্দিনের শারীরিক অবস্থা খারাপ দেখে উন্নত চিকিৎসার জন্য কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে পাঠানোর পরামর্শ দেন। পরে পুলিশ তাঁকে সেখানে নিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করে।
সাধারণ গ্রাহকদের অভিযোগ, সরলতার সুযোগ নিয়ে অভিযুক্তরা প্রতারণা ও জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে হিসাবের বই, জমা রসিদ এবং সংশ্লিষ্ট নথি পরিবর্তন করে তাঁদের জমাকৃত টাকা অভিযুক্ত ও তাঁদের সহযোগীদের হিসাবে স্থানান্তর করে আত্মসাৎ করেছেন। একইভাবে ওই আউটলেটের আরও অনেক গ্রাহকের কয়েক কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
গ্রাহকেরা স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের মাধ্যমে তাদের জমা করা টাকা উদ্ধারের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। পরে তারা থানায় এজাহার দায়ের করেন।
উখিয়া থানার ওসি আতিকুর রহমান মজুমদার বলেন, উপজেলার পালংখালীতে আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের একটি আউটলেট শাখায় গ্রাহকদের টাকা আত্মসাতের অভিযোগে থানায় এজাহার দেওয়া হয়েছে। অভিযোগের পর পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে। বুধবার দুপুরে তাদের আদালতে প্রেরণ করা হয়েছে। বিষয়টি গুরুত্বসহকারে তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। এজাহারে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে, সেগুলোর সত্যতা যাচাই করা হবে। তদন্তে অপরাধের প্রমাণ পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে আউটলেটটির ম্যানেজার হাবিব উল্লাহ ফরহাদ ও অন্যান্য কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে তার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও ব্যবহৃত মুঠোফোন নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
তবে গ্রাহকদের টাকা আত্মসাতের অভিযোগের সত্যতা ও এর সঙ্গে কারা জড়িত, তা তদন্তের পরই নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।