বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার টাকা নয়ছয়: ‘হিট’ প্রকল্প ঘিরে অনিয়মের অভিযোগ

দেশের উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নে নেওয়া চার হাজার কোটি টাকার ‘হায়ার এডুকেশন অ্যাকসেলারেশন অ্যান্ড ট্রান্সফরমেশন (হিট)’ প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত এই প্রকল্পে গবেষণার পরিবর্তে অর্থ লোপাট ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সমালোচনার মুখে পড়েছেন।

দেশে বর্তমানে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে ১৭০টির বেশি বিশ্ববিদ্যালয় থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই গবেষণা কার্যক্রম সীমিত। এই প্রেক্ষাপটে গবেষণা জোরদার ও নতুন জ্ঞান সৃষ্টির লক্ষ্যে ২০২৩ সালের জুলাইয়ে পাঁচ বছর মেয়াদি ‘হিট’ প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। মোট ৪ হাজার ১৬ কোটি ৫৭ লাখ টাকার এই প্রকল্পে প্রায় অর্ধেক অর্থায়ন করছে বিশ্বব্যাংক।

তবে প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে শুরু থেকেই নানা অভিযোগ ওঠে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গবেষণা খাতে বরাদ্দকৃত অর্থের বড় অংশ অনিয়মের মাধ্যমে ভাগ-বাটোয়ারা করা হচ্ছে। বিশ্বব্যাংক ইতোমধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়ে অসন্তোষের কথা জানিয়েছে। এতে প্রকল্পের উদ্দেশ্য ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকের পর শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানান, ‘হিট’ প্রকল্প নিয়ে তারা নেতিবাচক মন্তব্য করেছেন এবং সন্তুষ্ট নন। তবে ইউজিসি এক বিজ্ঞপ্তিতে দাবি করেছে, প্রকল্পের বাস্তবায়ন অগ্রগতি ‘মাঝারি মানের সন্তোষজনক’।

অভিযোগ প্রসঙ্গে ইউজিসির দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্য অধ্যাপক মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান বলেন, এখন পর্যন্ত গবেষণা খাতে মাত্র ১১৬ কোটি টাকা ছাড় হয়েছে এবং অনিয়মের অভিযোগ সঠিক নয়। তিনি জানান, পূর্বনির্ধারিত ডিপিপি অনুযায়ী কাজ করতে গিয়ে কিছু জটিলতা তৈরি হয়েছে।

অন্যদিকে, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের একাধিক শিক্ষক সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করেন, প্রকল্পে যোগ্য গবেষকদের বাদ দিয়ে কম সাইটেশনধারী ও অপেক্ষাকৃত অপ্রতিষ্ঠিত শিক্ষকদের প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। তাঁদের দাবি, প্রায় ৪০ শতাংশ নির্বাচিত গবেষকের সাইটেশন ১০০-এর কম এবং অনেক ক্ষেত্রে ৫০০-এর নিচে। এতে গবেষণার মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

শিক্ষকদের আরও অভিযোগ, প্রকল্প মূল্যায়নে মেধা ও যোগ্যতার বদলে রাজনৈতিক আনুগত্য ও ব্যক্তিগত সম্পর্ক গুরুত্ব পেয়েছে। এমনকি এক বিষয়ের শিক্ষক দিয়ে ভিন্ন বিষয়ের গবেষণা প্রস্তাব মূল্যায়ন করানোর ঘটনাও ঘটেছে, যা একাডেমিক মানদণ্ডের পরিপন্থী।

এতসব অভিযোগের মধ্যেই গত বছরের আগস্টে ৪৩টি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে ১৫১টি উপপ্রকল্প বাস্তবায়নে চুক্তি করে ইউজিসি এবং ইতোমধ্যে কয়েক শ কোটি টাকা ছাড় করা হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা ছাড়ের পরিকল্পনা রয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক উপাচার্য বলেন, প্রকল্পের লক্ষ্য ভালো হলেও বাস্তবায়নে দায়িত্বপ্রাপ্তদের কারণে সমস্যা তৈরি হয়েছে। তিনি মনে করেন, প্রথম পর্যায়ের অভিযোগগুলোতে আংশিক সত্যতা থাকতে পারে এবং দ্বিতীয় পর্যায়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি।

আরও গুরুতর অভিযোগ এসেছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে। সংশ্লিষ্টরা দাবি করেন, রিভিউয়ারদের প্রভাবিত করে নিজেদের অনুগত শিক্ষকদের প্রকল্প পাইয়ে দেওয়া হয়েছে। সর্বোচ্চ নম্বরের বিনিময়ে অর্থ লেনদেন এবং প্রকল্পপ্রাপ্তদের সঙ্গে অর্থ ভাগাভাগির মৌখিক চুক্তির অভিযোগও রয়েছে। এতে শত কোটি টাকার অনিয়ম হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

এদিকে ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে দ্বিতীয় পর্যায়ের মূল্যায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের বিভ্রান্তি বা প্রশ্ন যাতে না ওঠে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।

প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্র আরও জানায়, শুরুতেই প্রকল্প পরিচালক (পিডি) নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। নিয়োগ পরীক্ষায় প্রথম হওয়া প্রার্থীকে বাদ দিয়ে রাজনৈতিক বিবেচনায় অন্যজনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। এ নিয়ে বঞ্চিত প্রার্থী পুনর্বহালের আবেদন করলেও তা এখনও নিষ্পত্তি হয়নি।

এছাড়া প্রথম পর্যায়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বৈষম্যের শিকার হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কোনো প্রকল্প না পেলেও তুলনামূলক কম গবেষণা-সক্ষম প্রতিষ্ঠানগুলো একাধিক প্রকল্প পেয়েছে।

সব মিলিয়ে উচ্চশিক্ষায় গবেষণার উন্নয়নকে লক্ষ্য করে নেওয়া ‘হিট’ প্রকল্প এখন নানা অনিয়ম ও বিতর্কে প্রশ্নবিদ্ধ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দ্রুত স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে এই বড় বিনিয়োগের সুফল পাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।

পাঠকের মন্তব্য