বিদ্যুৎ খাতের অর্থনৈতিক বোঝা কমাতে নীতিগত সংস্কারের তাগিদ

দেশের বিদ্যুৎ খাত অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা, আমদানিনির্ভর জ্বালানি, ক্যাপাসিটি চার্জ এবং ভর্তুকির চাপে বড় ধরনের অর্থনৈতিক বোঝা তৈরি করছে বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা বলেছেন, জ্বালানি খাতের দীর্ঘমেয়াদি সংকট মোকাবিলায় সমন্বিত নীতিমালা, বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে গুরুত্ব বাড়ানো প্রয়োজন।

রাজধানীর রমনায় ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, বাংলাদেশ (আইইবি) সদর দপ্তরের শহীদ প্রকৌশলী ভবনের কাউন্সিল হলে রোববার বিকেলে আয়োজিত ‘বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের সৃষ্ট অর্থনৈতিক বোঝা: সংকট ব্যবস্থাপনায় নীতিগত সুপারিশ’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন। আইইবির যন্ত্রকৌশল বিভাগের উদ্যোগে এ সেমিনারের আয়োজন করা হয়।

জ্বালানি খাত ‘মাইনাস অবস্থানে’
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা), বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) ও মিয়ানমার ইকোনমিক জোন অথরিটির (মিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি)-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আশিক চৌধুরী বলেন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, শিল্পায়ন ও টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য নির্ভরযোগ্য জ্বালানি ব্যবস্থার বিকল্প নেই। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, দেশের জ্বালানি খাত বর্তমানে নানা সীমাবদ্ধতা ও আর্থিক চাপে কার্যত ‘মাইনাস অবস্থানে’ রয়েছে।

তিনি বলেন, অতীতে সম্পাদিত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চুক্তি ও সমঝোতার কারণে সরকারকে অনেক বাধ্যবাধকতা বহন করতে হচ্ছে। এর ফলে বড় আকারের নতুন প্রকল্প নেওয়ার ক্ষেত্রও সীমিত হয়ে পড়েছে।

বিশেষ করে বিদ্যুৎ খাতে ক্যাপাসিটি চার্জকে বড় আর্থিক বোঝা হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, উৎপাদন না হলেও বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে নির্ধারিত অর্থ পরিশোধ করতে হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় অর্থনীতির জন্য উদ্বেগজনক।

এ পরিস্থিতিতে সৌরশক্তিসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। আশিক চৌধুরীর মতে, দেশের ভৌগোলিক অবস্থান ও পর্যাপ্ত সূর্যালোকের সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে আমদানিনির্ভরতা কমবে, পরিবেশ সুরক্ষিত থাকবে এবং অর্থনৈতিক চাপও হ্রাস পাবে।

গ্যাসের অপচয়ের খেসারত দিচ্ছে দেশ
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে আইইবির সভাপতি ও রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মোহাম্মদ রিয়াজুল ইসলাম (রিজু) বলেন, দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও অপচয়ের কারণে দেশের গ্যাস খাত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তিনি বলেন, একসময় গ্যাসের অপচয়কে স্বাভাবিক বিষয় হিসেবে দেখা হতো। পরিকল্পনার অভাব ও অবিবেচনাপ্রসূত ব্যবহারের কারণে আজ শিল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং সাধারণ মানুষের জীবনেও গ্যাস সংকটের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

তবে তিনি বলেন, সরকার বর্তমানে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও পেশাজীবীদের মতামত নিয়ে জ্বালানি খাতের সমস্যা সমাধানে কাজ করছে। সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে এ খাতকে আরও টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো সম্ভব হবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।

প্রকল্প মূল্যায়নের ঘাটতির সমালোচনা
স্বাগত বক্তব্যে আইইবির সম্মানী সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. প্রকৌশলী মো. সাব্বির মোস্তফা খান বলেন, অতীতে বিদ্যুৎ খাতে অনেক প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা ও অর্থনৈতিক লাভ-ক্ষতির যথাযথ মূল্যায়ন করা হয়নি।

তিনি বলেন, অনেক সময় সম্ভাব্যতা যাচাই থাকলেও বাস্তবায়নের পর প্রকল্পগুলো প্রত্যাশা পূরণ করছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করা হয়নি। ফলে অনেক প্রকল্প জাতীয় অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছে।

তিনি আরও বলেন, দেশের অধিকাংশ বিদ্যুৎকেন্দ্র আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্য বাড়লেই বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে দেশীয় জ্বালানি সম্পদের ব্যবহার বাড়ানো এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিস্তার জরুরি।
অতিরিক্ত সক্ষমতা ও ভর্তুকির চাপ

সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির (ইউআইইউ) ইমেরিটাস অধ্যাপক ও পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. প্রকৌশলী এম. রেজওয়ান খান।

তিনি বলেন, গত এক দশকে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেলেও খাতটি এখন গভীর আর্থিক সংকটে রয়েছে। অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা, ব্যয়বহুল আমদানিনির্ভর জ্বালানি, ক্যাপাসিটি পেমেন্ট, ভর্তুকির চাপ এবং দুর্বল নীতিগত ব্যবস্থাপনার কারণে জাতীয় অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।

তিনি বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা চাহিদার তুলনায় বেশি হওয়ায় অনেক কেন্দ্র অলস অবস্থায় থাকছে। কিন্তু চুক্তি অনুযায়ী সরকারকে এসব কেন্দ্রের জন্য ক্যাপাসিটি পেমেন্ট দিতে হচ্ছে, যা বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) জন্য বড় আর্থিক দায়ে পরিণত হয়েছে।
অধ্যাপক রেজওয়ান খান আরও বলেন, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ায় বিদ্যুৎ খাত ক্রমেই তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস, কয়লা ও তেলের মতো আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে, ফলে সরকারকে বেশি ভর্তুকি দিতে হচ্ছে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে।

সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন আইইবির যন্ত্রকৌশল বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. প্রকৌশলী মোহাম্মাদ আলী। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন বিভাগের সম্পাদক প্রকৌশলী মুহাম্মাদ কামরুল হাসান খান। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন বিভাগের ভাইস চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. কামাল হোসেন।
এ সময় আইইবির কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ, কাউন্সিল সদস্য, বিভিন্ন প্রকৌশল বিভাগের প্রতিনিধি, প্রকৌশল চ্যাপ্টারের নেতৃবৃন্দ এবং বিভিন্ন সংস্থার প্রকৌশলীরা উপস্থিত ছিলেন।

পাঠকের মন্তব্য