মহাকাশ প্রযুক্তিকে বিলাসিতা হিসেবে নেয়নি সরকার, স্যাটেলাইট ঘিরে নতুন পরিকল্পনা

বাংলাদেশে মহাকাশ, স্যাটেলাইট ও ড্রোন প্রযুক্তিকে সরকার কখনো বিলাসিতা হিসেবে দেখেনি বলে জানিয়েছেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। 

তাঁর ভাষ্য, প্রযুক্তিনির্ভর উন্নয়নের এই সময়ে স্যাটেলাইট, ড্রোন ও মহাকাশ প্রযুক্তি জাতীয় উন্নয়ন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, কৃষি, মৎস্য, যোগাযোগ ও নিরাপত্তা খাতের অপরিহার্য অবকাঠামোতে পরিণত হয়েছে।
সোমবার রাজধানীর রমনায় ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, বাংলাদেশ (আইইবি) সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত ‘Satellites, Drones and the Future of Space Technology in Bangladesh’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সেমিনারের আয়োজন করে আইইবির কম্পিউটারকৌশল বিভাগ।

মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের মহাকাশ প্রযুক্তির যাত্রায় সবচেয়ে বড় মাইলফলক হলো স্যাটেলাইট–১ উৎক্ষেপণ। ২০১৮ সালে এটি উৎক্ষেপণের মাধ্যমে বাংলাদেশ বিশ্বের ৫৭তম স্যাটেলাইট পরিচালনাকারী দেশে পরিণত হয়। 

বর্তমানে স্যাটেলাইটটি দেশের টেলিভিশন সম্প্রচার, টেলিযোগাযোগ, ইন্টারনেট সংযোগ এবং দুর্যোগকালীন যোগাযোগ ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় ও স্যাটেলাইটভিত্তিক সেবার নতুন বাজার তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

ফকির মাহবুব আনাম বলেন, স্যাটেলাইট–১ প্রায় ৩৬ হাজার কিলোমিটার উচ্চতায় জিওস্টেশনারি কক্ষপথে অবস্থান করছে, যা দীর্ঘমেয়াদি যোগাযোগ সেবা নিশ্চিত করছে। তবে সরকার এখন লো আর্থ অরবিট (LEO) ভিত্তিক নতুন স্যাটেলাইট স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। প্রায় ৫০০ মাইল উচ্চতায় অবস্থানকারী এ ধরনের স্যাটেলাইট থেকে পৃথিবীর ছবি ও তথ্য আরও স্পষ্ট ও নির্ভুলভাবে সংগ্রহ করা সম্ভব হবে, যা কৃষি, নদীভাঙন পর্যবেক্ষণ, উপকূলীয় নিরাপত্তা, পরিবেশ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

মন্ত্রী বলেন, স্যাটেলাইট প্রযুক্তির মাধ্যমে সাইক্লোন ও বৈরী আবহাওয়ার পূর্বাভাস দ্রুত উপকূলীয় এলাকার জেলেদের কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। সমুদ্রের তাপমাত্রা, স্রোতের গতি ও আবহাওয়ার তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে গভীর সমুদ্রে অবস্থানরত জেলেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে।

ড্রোন প্রযুক্তি নিয়েও সরকারের গুরুত্বারোপের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ড্রোন এখন আর শুধু ফটোগ্রাফি বা বিনোদনের যন্ত্র নয়; এটি সীমান্ত নিরাপত্তা, কৃষি ব্যবস্থাপনা, ভূমি জরিপ, অবকাঠামো পর্যবেক্ষণ এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় কার্যকর প্রযুক্তিগত প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

সেমিনারে কি-নোট স্পিকার হিসেবে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেডের (বিএসসিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. মুহাম্মদ ইমাদুর রহমান। 

তিনি বলেন, বর্তমান বিশ্বে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের অন্যতম চালিকাশক্তি হচ্ছে মহাকাশ প্রযুক্তি, স্যাটেলাইট ও ড্রোন প্রযুক্তি। উন্নত বিশ্বের পাশাপাশি উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্যও এটি এখন অর্থনৈতিক উন্নয়ন, নিরাপত্তা, কৃষি ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।

ড. ইমাদুর রহমান বলেন, স্যাটেলাইট ডাটার মাধ্যমে সমুদ্রের তাপমাত্রা, পানির গভীরতা, স্রোতের গতি এবং প্ল্যাংকটনের অবস্থান নির্ণয় করা সম্ভব। যেসব এলাকায় প্ল্যাংকটনের উপস্থিতি বেশি, সেখানে মাছের উপস্থিতির সম্ভাবনাও বেশি থাকে। ফলে তথ্য বিশ্লেষণ করে জেলেদের সম্ভাব্য মাছ ধরার স্থান সম্পর্কে আগাম ধারণা দেওয়া যায়। এতে জ্বালানি খরচ কমে, সময় সাশ্রয় হয় এবং মাছ আহরণ বাড়তে পারে।

তিনি আরও বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশের জন্য রিমোট সেন্সিং ও স্যাটেলাইট ডাটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভবিষ্যতে নিজস্ব আবহাওয়া ও পৃথিবী পর্যবেক্ষণ স্যাটেলাইট তৈরি করা গেলে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসতে পারে।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে আইইবির প্রেসিডেন্ট ও রাজউকের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মোহাম্মদ রিয়াজুল ইসলাম (রিজু) বলেন, স্যাটেলাইট প্রযুক্তির মাধ্যমে কৃষি ও মৎস্য খাতে উল্লেখযোগ্য সুফল মিলছে। আবহাওয়ার পূর্বাভাস, জমির অবস্থা, পানির প্রবাহ, নদীভাঙন ও সমুদ্রের তথ্য সহজে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হওয়ায় কৃষক ও জেলেরা সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন দ্রুত। ড্রোন প্রযুক্তির ব্যবহারে তথ্য সংগ্রহ আরও নির্ভুল হয়েছে।

অ্যাসোসিয়েশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশ (অ্যাব)-এর আহ্বায়ক প্রকৌশলী শাহরিন ইসলাম তুহিন বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্যাটেলাইট, ড্রোন, রোবোটিকস ও মহাকাশ গবেষণার দ্রুত অগ্রগতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশকে গবেষণা, উদ্ভাবন ও দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে জোর দিতে হবে।

কম্পিউটারকৌশল বিভাগের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. শাহীন হাওলাদারের সভাপতিত্বে সেমিনারে আরও উপস্থিত ছিলেন আইইবির ভাইস প্রেসিডেন্ট (একাডেমিক ও আন্তর্জাতিক) প্রকৌশলী খান মনজুর মোরশেদ, ভাইস প্রেসিডেন্ট (এইচআরডি) প্রকৌশলী শেখ আল আমিন এবং সম্মানী সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. প্রকৌশলী মো. সাব্বির মোস্তফা খান। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন প্রকৌশলী মোহাম্মদ আবুল কাশম ও প্রকৌশলী এইচ এম মইনুল ইসলাম।

পাঠকের মন্তব্য