গবেষণা থেকে সমাজে প্রয়োগেই এআইয়ের সাফল্য: আইইবি সেমিনারে বক্তারা

গবেষণাগারে সীমাবদ্ধ না থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তিকে মানুষের দৈনন্দিন জীবন, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, কৃষি ও নগর ব্যবস্থাপনায় কার্যকরভাবে প্রয়োগের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বক্তারা। তাঁরা বলেছেন, গবেষণালব্ধ জ্ঞান বাস্তব সমস্যার সমাধানে ব্যবহার করেই এআইয়ের প্রকৃত সামাজিক প্রভাব নিশ্চিত করা সম্ভব।

সোমবার সন্ধ্যায় রাজধানীর রমনায় ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, বাংলাদেশ (আইইবি) সদর দপ্তরের শহীদ প্রকৌশলী ভবনের কাউন্সিল হলে আয়োজিত ‘Translational Artificial Intelligence: From Research to Societal Impact’ শীর্ষক সেমিনারে এসব কথা বলা হয়। আইইবির উইমেন ইঞ্জিনিয়ার্স চ্যাপ্টার এ সেমিনারের আয়োজন করে।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা (পলিসি ও স্ট্র্যাটেজি) ডা. জাহেদ-উর রহমান। তিনি বলেন, মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে সহজ, দ্রুত ও কার্যকর করতে এআই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে স্বাস্থ্যসেবায় এর ব্যবহার বাড়ছে। অটিজমে আক্রান্ত শিশুদের আচরণ বিশ্লেষণ, মানসিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ এবং থেরাপি আরও কার্যকর করতে এআই সহায়ক হতে পারে।

ডা. জাহেদ-উর রহমান বলেন, প্রযুক্তিনির্ভর দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে আধুনিক প্রযুক্তি, বিশেষ করে এআই বিষয়ে দক্ষতা অর্জনের বিকল্প নেই।

বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত অ্যাসোসিয়েশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশ (অ্যাব)–এর আহ্বায়ক প্রকৌশলী শাহরিন ইসলাম তুহিন বলেন, তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তাকারী প্রযুক্তি হিসেবে এআই এখন বিভিন্ন খাতে আধুনিক সেবা নিশ্চিত করছে। স্মার্ট সিটি ব্যবস্থাপনায় এআই ব্যবহারের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, উন্নত ক্যামেরা, সেন্সর ও ডিজিটাল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে শহরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দুর্ঘটনা বা জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব।

সেমিনারে স্বাগত বক্তব্য দেন আইইবির সম্মানী সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. প্রকৌশলী মো. সাব্বির মোস্তফা খান। তিনি বলেন, বিশ্বজুড়ে শিল্প খাতে, বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পে এআই ও রোবট প্রযুক্তির ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। উৎপাদন, মান নিয়ন্ত্রণ, নকশা, কাটিং ও সরবরাহ ব্যবস্থায় এ প্রযুক্তির ব্যবহার ব্যয় কমানোর পাশাপাশি দক্ষতা বাড়াচ্ছে। তবে এর ফলে কর্মসংস্থানে প্রভাব এবং প্রযুক্তিনির্ভরতার ঝুঁকি নিয়েও ভাবতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কম্পিউটারকৌশল বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. প্রকৌশলী তানজিমা হাশেম। তিনি বলেন, গবেষণাগারে উদ্ভাবিত এআই প্রযুক্তি যখন বাস্তব জীবনের সমস্যা সমাধানে ব্যবহার হয়ে সমাজ ও অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলে, তখন সেটিই ‘Translational Artificial Intelligence’ হিসেবে বিবেচিত হয়।

তিনি জানান, স্বাস্থ্য খাতে রোগ নির্ণয়, মেডিকেল ইমেজ বিশ্লেষণ ও ওষুধ উদ্ভাবনে এআই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কৃষিতে মাটি, আবহাওয়া ও ফসলের তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধি ও রোগ শনাক্তকরণ সহজ হচ্ছে। শিক্ষা খাতে ব্যক্তিকেন্দ্রিক শেখার ব্যবস্থাও এআই–ভিত্তিক প্রযুক্তির মাধ্যমে বিস্তৃত হচ্ছে।

সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন আইইবির সভাপতি ও রাজউকের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মোহাম্মদ রিয়াজুল ইসলাম (রিজু)। তিনি নগর ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির প্রয়োগের পাশাপাশি ভবনে অনুমোদিত পার্কিং ব্যবস্থার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন। তাঁর ভাষ্য, নির্ধারিত পার্কিং স্থান অন্য কাজে ব্যবহার হওয়ায় নগর এলাকায় যানজট ও জনদুর্ভোগ বাড়ছে। সেমিনার থেকে আসা সুপারিশগুলো সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরে পাঠিয়ে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়ার কথাও বলেন তিনি।

ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন আইইবির উইমেন ইঞ্জিনিয়ার্স চ্যাপ্টারের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী শাহানাজ শারমিন। তিনি বলেন, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, কৃষি, শিল্প ও নগর ব্যবস্থাপনায় এআইয়ের বাস্তব প্রয়োগের সুযোগ বাড়ছে। বাংলাদেশ সরকার ২০২৬–২০৩৬ মেয়াদের জন্য এআই–সংক্রান্ত নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে, যা সময়োপযোগী পদক্ষেপ। তবে প্রযুক্তি খাতে নারীদের অংশগ্রহণ ও নেতৃত্ব নিশ্চিত করাও জরুরি বলে মন্তব্য করেন তিনি।

সেমিনার সঞ্চালনা করেন উইমেন ইঞ্জিনিয়ার্স চ্যাপ্টারের সম্পাদক প্রকৌশলী ইশরাত জাহান। তিনি বলেন, বাংলা ভাষায় তথ্যভান্ডার সমৃদ্ধ করা ছাড়া বাংলাদেশে এআই–ভিত্তিক প্রযুক্তির বিস্তার কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছাবে না।

অনুষ্ঠানে আইইবির বিভিন্ন বিভাগের নেতৃবৃন্দ, কেন্দ্রীয় কাউন্সিলের সদস্য এবং বিভিন্ন প্রকৌশল সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

পাঠকের মন্তব্য