রাইটস শেয়ার অনুমোদন: ইউসিবির মূলধন বাড়ছে ৭৭৫ কোটি টাকা

মূলধন সক্ষমতা বাড়াতে ৭৭৫ কোটি টাকার রাইটস শেয়ার ছাড়ার অনুমোদন পেয়েছে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক পিএলসি (ইউসিবি)। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) অনুমোদন পাওয়া এ উদ্যোগের মাধ্যমে ব্যাংকটির পরিশোধিত মূলধন ১ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ২ হাজার ৩২৫ কোটি টাকায় উন্নীত হবে। ব্যাংকটির মূলধন ভিত্তি শক্তিশালী করা এবং ভবিষ্যৎ ব্যবসা সম্প্রসারণের সক্ষমতা বাড়ানোই এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।

অনুমোদিত প্রস্তাব অনুযায়ী, ইউসিবির বিদ্যমান শেয়ারহোল্ডাররা প্রতি দুটি শেয়ারের বিপরীতে একটি করে নতুন শেয়ার কেনার সুযোগ পাবেন। প্রতিটি শেয়ারের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ টাকা। এ ক্ষেত্রে কোনো প্রিমিয়াম রাখা হয়নি। ফলে বিদ্যমান শেয়ারহোল্ডারদের অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করেই মূলধন সংগ্রহ করতে যাচ্ছে ব্যাংকটি।

দেশের ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘদিন ধরে চলমান মূলধন ঘাটতির চাপের মধ্যেই ইউসিবির এ উদ্যোগ এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ফিন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্ট ২০২৫ অনুযায়ী, গত বছরের শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতের গড় মূলধন পর্যাপ্ততা অনুপাত (CRAR) নেমে এসেছে নেতিবাচক ২ দশমিক ৬৪ শতাংশে। আন্তর্জাতিক বাসেল III কাঠামো অনুযায়ী ব্যাংকগুলোর জন্য এ হার ন্যূনতম ১২ দশমিক ৫০ শতাংশ থাকার কথা। বর্তমানে দেশের প্রায় দুই ডজন ব্যাংক মূলধন ঘাটতিতে রয়েছে এবং এসব প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত ঘাটতির পরিমাণ ২ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকার বেশি।

ইউসিবির রাইটস অফারের মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থ ব্যাংকের মূলধনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ কমন ইকুইটি টিয়ার-১ (CET-1) মূলধনে যুক্ত হবে। ব্যাংকের আর্থিক স্থিতিশীলতা মূল্যায়নে এ মূলধনকে সবচেয়ে শক্তিশালী উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

২০২৫ সালের শেষে ইউসিবির প্রতি ১০০ টাকার ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের বিপরীতে মূলধন ছিল প্রায় ৮ টাকা ৪২ পয়সা। বাসেল III-এর সংরক্ষণ বাফারসহ প্রয়োজনীয় ১২ দশমিক ৫০ শতাংশের তুলনায় এ হার কম। নতুন মূলধন যুক্ত হলে এ ব্যবধান কমবে বলে আশা করছে ব্যাংকটি। একই সঙ্গে ইউসিবির ৮০০ কোটি টাকার অধস্তন বন্ড ইস্যুর কার্যক্রমও চলমান রয়েছে, যা মূলধন কাঠামো শক্তিশালী করতে সহায়তা করবে।
সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ ও প্রভিশন ঘাটতি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে এসেছে। ইউসিবির প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের হার ১৫ দশমিক ৫০ শতাংশ এবং প্রভিশন ঘাটতির পরিমাণ ৫ হাজার ৫৯৫ কোটি টাকা। ২০২৪ সালের পর ব্যাংকিং খাতে সম্পদের মান নিয়ে যে চাপ তৈরি হয়েছে, তার প্রভাব ইউসিবির আর্থিক সূচকেও পড়েছে।

তবে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় মূলধন বাড়ানোর পথ বেছে নিয়েছে ব্যাংকটি। ইউসিবির কর্মকর্তারা মনে করছেন, নতুন মূলধন যুক্ত হলে ভবিষ্যতে ঋণ বিতরণ সক্ষমতা বাড়বে এবং আমানতের অর্থ আরও কার্যকরভাবে বিনিয়োগ করা সম্ভব হবে। ২০২৫ সালে ব্যাংকটির আমানত ২৩ শতাংশ বেড়ে ৬৮ হাজার ৩৯৪ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।

শক্তিশালী মূলধন কাঠামো ব্যাংকটির আন্তর্জাতিক কার্যক্রমেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে বিদেশি করেসপন্ডেন্ট ব্যাংকিং সম্পর্ক ধরে রাখা ও সম্প্রসারণে এটি সহায়ক হবে বলে মনে করা হচ্ছে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে ব্যাংকের ক্রেডিট রেটিং উন্নত হলে অর্থ সংগ্রহের ব্যয় কমার সম্ভাবনাও রয়েছে।
মূলধন অবস্থার উন্নতি হলে ভবিষ্যতে লভ্যাংশ দেওয়ার সক্ষমতাও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী, উচ্চমাত্রার খেলাপি ঋণ বা প্রভিশন ঘাটতি থাকা ব্যাংকের লভ্যাংশ বিতরণে সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

এদিকে শেয়ারহোল্ডারদের জন্যও রাইটস অফারটি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে ব্যাংকটি। ইউসিবির নিরীক্ষিত নিট সম্পদ মূল্য (NAV) প্রতি শেয়ারে ২৭ দশমিক ১২ টাকা হলেও নতুন শেয়ার ইস্যুর মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ টাকা। এর ফলে বিদ্যমান শেয়ারহোল্ডারদের জন্য মূল্যের ব্যবধান একটি আকর্ষণীয় বিষয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

এ ব্যাপারে ইউসিবির উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) ফারুক আহমেদ বলেন, ‘রাইটস অফার বাস্তবায়নের মাধ্যমে মূলধন ভিত্তি শক্তিশালী হবে, বাজার আস্থা বাড়বে এবং দীর্ঘমেয়াদে ইউসিবির ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধির নতুন সুযোগ তৈরি হবে।’

পাঠকের মন্তব্য