পদ্মা ব্যারেজের নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক, ৬১ জনকে ডিঙিয়ে পিডি বঙ্গবন্ধু পরিষদের নেতা
-
- - নিজস্ব -
- প্রতিবেদক --
- ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ের পরিচালক (পিডি) নিয়োগ পেয়েছেন হাসান মাহমুদ। তিনি কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সমর্থক বঙ্গবন্ধু পরিষদের পানি উন্নয়ন বোর্ড শাখার নির্বাহী সদস্য ছিলেন। এই নিয়োগ ঘিরে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন ও গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।
গত ২৭ আগস্ট পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন-২ শাখার অফিস আদেশে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (পুর) হাসান মাহমুদকে নিজ দায়িত্বের অতিরিক্ত পদ্মা ব্যারেজ (প্রথম পর্যায়) প্রকল্পের পরিচালক পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। এতে সই করেছেন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব আব্দুর রহিম রিপন।
পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পের অনুমোদিত জনবল কাঠামোয় পরিচালক হতে হলে দ্বিতীয় অথবা তৃতীয় গ্রেডের কর্মকর্তা তথা প্রকৌশলী হওয়ার নিয়ম। তবে নিয়োগ পাওয়া হাসান মাহমুদ চতুর্থ গ্রেডের প্রকৌশলী। শুধু তাই নয়, হাসান মাহমুদের আগে পাউবোতে অন্তত ৬১ জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা আছেন। সবাইকে ডিঙিয়েই তিনি নিয়োগ পেয়েছেন। এর আগে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সেচ প্রকল্প তিস্তা সেচ প্রকল্প এর প্রকল্প পরিচালক ছিলেন প্রধান প্রকৌশলী সিরাজুল ইসলাম। প্রকৌশলী সিরাজুল ইসলাম ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী, সৎ ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ব্যক্তি। তিনি বুয়েট ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম স্থান অর্জন করেছিলেন।
এই নিয়োগ নিয়ে পাউবো কর্মকর্তাদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। পাউবো প্রকৌশলীরা বলছেন, দেশের অন্যতম বৃহৎ সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনা পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প। বিএনপি সরকারের এই প্রকল্পের শীর্ষ পদে হাসান মাহমুদের মতো ‘বিতর্কিত’ ব্যক্তির নিয়োগ স্বচ্ছতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলবে। বিষয়টি সুষ্ঠু তদন্ত ও নিয়োগ আদেশ পুনর্বিবেচনার দাবিও জানিয়েছেন তাঁরা।
পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পে অনুমোদিত জনবল কাঠামোর তালিকা অনুযায়ী, পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পের পিডি পদটি দ্বিতীয় অথবা তৃতীয় গ্রেডের। নিয়মে প্রধান প্রকৌশলী বা অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী এই দায়িত্ব পাওয়ার কথা। কিন্তু হাসান মাহমুদ বর্তমানে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, যা চতুর্থ গ্রেড।
হাসান মাহমুদের বাড়ি বগুড়া সদরে। অভিযোগ অস্বীকার করে হাসান মাহমুদ বলেছেন, ‘পিডি নিয়োগের ক্ষেত্রে আমার কী করার আছে? আমি অত বড় অফিসার না। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ যেটা ভালো মনে করেছে, সেটি করেছে। এখানে আমার তো চয়েজ নেই।’ বঙ্গবন্ধু পরিষদের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এই তালিকা কে বানিয়েছে, কারা কী করেছে, তা আমি জানি না। আমি শুধু বলতে পারি, কখনো রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলাম না।’
গ্রেড ও জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন
অনুসন্ধানে পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পের পরিচালক নিয়োগে সরকারি বিধি ও জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘনের তথ্য পাওয়া গেছে। অনুমোদিত জনবল কাঠামোর তালিকা অনুযায়ী, পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পের পিডি পদটি দ্বিতীয় অথবা তৃতীয় গ্রেডের। নিয়মে প্রধান প্রকৌশলী বা অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী এই দায়িত্ব পাওয়ার কথা। কিন্তু হাসান মাহমুদ বর্তমানে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, যা চতুর্থ গ্রেড।
পাউবো প্রকৌশলীদের (সিভিল ক্যাডার) জ্যেষ্ঠতার তালিকা বিশ্লেষণে দেখা যায়, হাসান মাহমুদের আগে প্রধান প্রকৌশলী, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী এবং জ্যেষ্ঠ তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদে অন্তত ৬১ জন কর্মরত। তালিকায় তাঁর অবস্থান ৬২।
আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ
নতুন প্রকল্প পরিচালক হাসান মাহমুদের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড বঙ্গবন্ধু পরিষদের ২০২২-২৪ মেয়াদের কমিটিতে হাসান মাহমুদের নাম রয়েছে। আওয়ামী লীগ সমর্থক বঙ্গবন্ধু পরিষদের সভাপতি ডা. এসএ মালেকের সই করা পাউবো শাখার কমিটিতে হাসান মাহমুদ সাত নম্বর নির্বাহী সদস্য। এই শাখার সভাপতি মিজানুর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক খন্দকার মাইনুর রহমান।
অভিযোগ উঠেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের প্রত্যক্ষ সুবিধাভোগী ও দলীয় সংগঠনের পদধারী নেতা হওয়া সত্ত্বেও হাসান মাহমুদকে এত বড় প্রকল্পের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
এ ব্যাপারে হাসান মাহমুদ বলেন, ‘আমি কখনো রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলাম না। আমি চুয়েটের ছাত্র, সেখানে ছাত্ররাজনীতি করিনি। আমি জাস্ট একজন জেনারেল স্টুডেন্ট।’
বঙ্গবন্ধু পরিষদের তালিকায় নাম থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এই লিস্ট কে বানিয়েছে, কারা কী করেছে, আমি কিছুই জানি না। আমার এই জাতীয় সংগঠনের সঙ্গে কোনো দিন অ্যাক্টিভিটি ছিল না।’
নিয়োগের প্রতিবাদ
গত ৩০ আগস্ট বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) ছাত্রদলের সাবেকদের সংগঠন ‘এক্স-জেসিডি, বুয়েট’– এর পক্ষে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে হাসান মাহমুদের নিয়োগের প্রতিবাদ জানিয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড বঙ্গবন্ধু পরিষদের ২০২২-২৪ মেয়াদের কমিটিতে হাসান মাহমুদের নাম রয়েছে। আওয়ামী লীগ সমর্থক বঙ্গবন্ধু পরিষদের সভাপতি ডা. এসএ মালেকের সই করা পাউবো শাখার কমিটিতে হাসান মাহমুদ সাত নম্বর নির্বাহী সদস্য।
এই সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক প্রকৌশলী শাহাদাত আহমেদ মাসুম নিজে বুয়েট ছাত্রদলের সভাপতি ছিলেন। চিঠিতে বলা হয়, বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের সুবিধাভোগী একজন প্রকৌশলীকে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে পদায়নপূর্বক ‘পদ্মা ব্যারেজ’ প্রকল্পের পিডি হিসেবে অন্যায়ভাবে নিয়োগ দেওয়ায় সাধারণ প্রকৌশলীদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দিয়েছে। এ নিয়ে মন্ত্রণালয়ের পদক্ষেপ চেয়েছে সংগঠনটি।
এ ব্যাপারে শাহাদাত আহমেদ মাসুম বলেন, আমরা পানিসম্পদমন্ত্রীর কাছে লিখিতভাবে এই নিয়োগের প্রতিবাদ দিয়েছি। আমাদের কাছে নির্ভরযোগ্য তথ্য রয়েছে– হাসান মাহমুদ আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। আমরা মন্ত্রীকে সবকিছু বলেছি। আশা করছি, তিনি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেবেন।
নাম প্রকাশ না করে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চিঠি আমলে নেওয়া হয়েছে। এই বিষয়ে তদন্ত হতে পারে।
৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকার প্রকল্প
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পানি ব্যবস্থাপনা, কৃষি, পরিবেশ ও খাদ্য নিরাপত্তার উন্নয়নে পদ্মা ব্যারেজ (প্রথম পর্যায়) প্রকল্প নিয়েছে সরকার। গত ১৩ মে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়।
প্রকল্পের আওতায় পদ্মার মিষ্টি পানির প্রবাহ ধরে রেখে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে লবণাক্ততার প্রভাব কমানো, শুষ্ক মৌসুমে সেচের জন্য পানি সংরক্ষণ এবং অনাবাদী জমি চাষের আওতায় আনা হবে। পাশাপাশি সুন্দরবনের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা, নদীভাঙন প্রতিরোধ এবং ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমাতে প্রকল্পটি ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।