উচ্চশিক্ষায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুরবস্থা, কঠোর হচ্ছে সরকার
উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় ভালো ফল করলেও মেডিকেল কলেজে ভর্তি হতে পারেননি আবির। ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিয়েও কৃতকার্য হতে পারেননি। পরে পারিবারিক সিদ্ধান্তে ভর্তি হয়েছেন বেসরকারি নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে।
অন্যদিকে ফরিদপুর একটি সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাসের পর পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ না পেয়ে ব্র্যাক ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হন আনোয়ার হোসেন।
দেশে এত বিশ্ববিদ্যালয় থাকতে নর্থ সাউথ কিংবা ব্র্যাককে কেন বেছে নিলেন—দুজনের কাছে আলাদাভাবে এ প্রশ্ন করা হলে তারা জানান, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ই ছিল তাদের প্রথম লক্ষ্য। তবে সেখানে সুযোগ না পাওয়ায় যেতে হয়েছে বেসরকারিতে। আর শিক্ষার মান, শিক্ষকদের প্রোফাইল, উন্নত ব্যবস্থাপনা, অবকাঠামো, সার্বিক পরিবেশ এবং সুনাম বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
শুধু আবির বা আনোয়ার নন, উচ্চ মাধ্যমিকের পাট চুকানোর পর দেশের বেশিরভাগ শিক্ষার্থীরই প্রথম পছন্দ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। তবে সেখানে ভর্তির সুযোগ না মিললে বা পছন্দের বিভাগ না পেলে সামর্থ্যবান পরিবারের সন্তানরা ছোটেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে। আর পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে যাদের ভর্তির সুযোগ নেই, তারা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতাধীন বিভিন্ন কলেজে ভর্তি হন। আবার নানা সীমাবদ্ধতা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার আশঙ্কায় সন্তানদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠাতে চায় না অনেক পরিবার। তাদের একাংশ উচ্চ শিক্ষার জন্য বিদেশে পাড়ি জমান। বাকিরা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে ছোটেন।
দেশে শতাধিক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠলেও শিক্ষার্থীদের পছন্দের তালিকাটি একেবারেই দীর্ঘ নয়। হাতেগোনা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিই বেশি আগ্রহ শিক্ষার্থীদের। এ তালিকায় ব্র্যাক ও নর্থ সাউথ ছাড়াও আছে ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি, আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস (ইউল্যাব), ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস এগ্রিকালচার অ্যান্ড টেকনোলজি, আহছানউল্লাহ ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসেফিক, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটি, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি, উত্তরা ইউনিভার্সিটি, বি জি এম ই এ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন এন্ড টেকনোলজি (বিইউএফটি), প্রেসিডেন্ট ইউনিভার্সিটি, ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি, ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড ইউনিভার্সিটিসহ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়। আবার এসব বিশ্ববিদ্যালয়েও সব বিভাগের প্রতি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ সমান নয়।
বাকি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রতি বেশিরভাগ শিক্ষার্থীর আগ্রহই নেই। অবশ্য কোথাও সুযোগ না পেয়ে শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়েই অনেকে এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। তবে সনদবাণিজ্য, মানসম্মত পাঠদানের ঘাটতি, যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষকের অভাব, বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার কারণে বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয় এখন বিষফোড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশে উচ্চশিক্ষার মান নিশ্চিত করতে হলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শৃঙ্খলার মধ্যে নিয়ে আসার বিকল্প নেই। উচ্চ শিক্ষায় বিশৃঙ্খলা দূর করতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেও কঠোর কোনো পদক্ষেপে নেওয়া জরুরি। তা না হলে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক সার্টিফিকেটধারী বের হলেও উচ্চ শিক্ষার প্রকৃত লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হবে না।
পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই, নেই শিক্ষার্থীও। অবকাঠামো নেই; তবুও চলছে বিশ্ববিদ্যালয়। রাজনৈতিক বলয় আর বাণিজ্যিক মানসিকতা থেকে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে ওঠা এসব বিশ্ববিদ্যালয় চলছে কোচিং সেন্টারের আদলে।
মাত্র তিন দশকের কিছু বেশি সময় আগে গবেষণানির্ভর শিক্ষাপ্রক্রিয়ায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হলেও এসব উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বেশির ভাগ যেন সনদ বিক্রির বৈধ প্রতিষ্ঠানে রূপ নিয়েছে! অদক্ষ শিক্ষক, মনগড়া টিউশন ফি, নামমাত্র গবেষণা, লোক দেখানো বাণিজ্যিক ওয়ার্কশপ-সেমিনার, নিয়ম বহির্ভূত সিটিং অ্যালাউন্স গ্রহণ আর উন্নয়নের নামে বিশ্ববিদ্যালয়ের টাকায় বিদেশ ভ্রমণ যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে শিক্ষক সংকট, গবেষণায় অনীহা আর নানা অব্যবস্থাপনায় মুখ থুবড়ে পড়েছে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়।
বর্তমানে সরকারি অনুমোদন পাওয়া দেশের ১১৬টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ৫টি এখনও শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করতে পারেনি। এই ৫টিসহ বর্তমানে দেশের ৩১টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় চলছে উপাচার্য ছাড়াই। আর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পদ উপ-উপাচার্য ও তারপরের পদ কোষাধ্যক্ষ নেই— এমন বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা আরও বেশি। দেশের বিশ্ববিদ্যালগুলোর নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সর্বশেষ হালনাগাদ করা এক তালিকায় এই তথ্য উঠে এসেছে।
কেন এমন দশা? শিক্ষাবিদরা বলছেন, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) পাঁচ দশকের অক্ষমতা, মনিটরিংয়ের অভাব, বিশ্ববিদ্যালয় উদ্যোক্তাদের বাণিজ্যিক মানসিকতা, উপাচার্য, উপউপাচার্যসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে জনবল নিয়োগ না দেওয়া, পর্যাপ্ত শিক্ষক সংকট, মানসম্পন্ন শিক্ষক নিয়োগ না দেওয়া, মনগড়া নিয়মে উচ্চ টিউশন ফি আদায়, শিক্ষক নিয়োগে নানা অনিয়মে দেশের বেসরকারি উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে এমন সংকট দেখা দিয়েছে।
ইউজিসির ক্ষমতায়ন, মনিটরিং বৃদ্ধি, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সরকারের নিবিড় সম্পৃক্ততা ও অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল গতিশীল করতে না পারলে এ সংকট আরও বাড়বে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তারা।
তাদের মতে, দেশে মাত্র ১৫ থেকে ২০টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ভালো করছে। বাকিগুলোর শিক্ষার মান খারাপ। কিছু বিশ্ববিদ্যালয় অনিয়ম, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার মধ্যে রয়েছে। কেউ কেউ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে পৈত্রিক বাগানবাড়িতে রূপ দিয়েছেন। এ সমস্যা থেকে বের হতে নামসর্বস্ব বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সতর্কতা এবং নির্দেশনা না মানলে বন্ধ করে দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন অনেকে।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন- ২০১০ অনুযায়ী অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ই তাদের মানদণ্ড ঠিক রাখতে পারছে না। এসব বিশ্ববিদ্যালয় উচ্চ শিক্ষায় তেমন কোনো অবদান রাখতে পারবে না বলেও মত তাদের।
দেশের বেশ কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান অস্থিরতায় ফের আলোচনা তাদের মান নিয়ে। গুরুতর অনিয়ম ও শর্ত লঙ্ঘনের কারণে রাজধানীর গাবতলীতে অবস্থিত ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের (ইইউবি) নামে পাশে তিন লাল তারকা (***) চিহ্ন বসিয়েছে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি)। এর ফলে প্রতিষ্ঠানটিতে নতুন শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রে কঠোর সতর্কবার্তা কার্যকর করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির বোর্ড অব ট্রাস্টিজ (বিওটি) বা মালিকানা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলমান দ্বন্দ্ব ও মামলা এখনো আদালতে নিষ্পত্তি হয়নি, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক স্থিতিশীলতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
অপরদিকে বোর্ড অব ট্রাস্টিজের (বিওটি) অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, পাল্টাপাল্টি অভিযোগ, ট্রাস্ট ডিড (চুক্তিপত্র) নিয়ে বিভক্তি এবং প্রশাসনিক শীর্ষ পদ শূন্য থাকাকে কেন্দ্র করে সংকট গভীর হয়েছে কুষ্টিয়ার রবীন্দ্র মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়টির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই পক্ষের বিরোধ এখন আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। এক পক্ষের অভিযোগ, গোপনে ‘ভুয়া ট্রাস্ট ডিড’ তৈরি করে মূল প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টিদের বাদ দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নেওয়া হয়েছে। অপর পক্ষ বলছে, দীর্ঘদিন বিদেশে অবস্থান, একক সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও অনিয়মের কারণেই সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ জহুরুল ইসলামসহ বাকিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হয়েছে।
এদিকে কিশোরগঞ্জের ঈশা খাঁ ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির স্থায়ী ক্যাম্পাস বাস্তবায়নের দাবিতে ‘শাটডাউন’ কর্মসূচি পালন করেছেন শিক্ষার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) নীতিমালা অনুযায়ী কোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় চালুর দুই বছরের মধ্যে নিজস্ব জমিতে স্থায়ী ক্যাম্পাস স্থাপন বাধ্যতামূলক। তবে অভিযোগ রয়েছে প্রতিষ্ঠার প্রায় ১৪ বছর পার হলেও এখনো স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণ করতে পারেনি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। শিক্ষার্থীদের দাবি, স্থায়ী ক্যাম্পাস না থাকায় বিশ্ববিদ্যালয়টি ইউজিসির মূল্যায়নে নিম্নমানের অবস্থানে রয়েছে। পাশাপাশি প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে ভবিষ্যতে সনদের গ্রহণযোগ্যতা ও পেশাগত জীবনে জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও করছেন শিক্ষার্থীরা।
দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে সম্প্রতি শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলন বলেছেন, ‘আমরা কোয়ান্টিটিতে অনেক এগিয়ে গেছি। কোয়ালিটিতে কতটুুকু পেরেছি, আমরা জানি না। ‘আগে বিদেশ থেকে শিক্ষকরা এসে পড়াতেন, শিক্ষার্থীরা আসতেন। এখন কিন্তু সে পর্যায়ে নেই। এখন দেশে ১১৬টি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়। ওপেন ইউনিভার্সিটি রয়েছে। সেই শিক্ষাব্যবস্থা আবারও ঢেলে সাজাতে হবে।’