বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পদোন্নতির মারপ্যাঁচ: মেধার অবমূল্যায়ন বনাম তোষামোদির সংস্কৃতি
ড. ফয়সালের (ছদ্মনাম) টেবিলজুড়ে ছড়ানো আন্তর্জাতিক নানা জার্নালের কপি। দেশের অন্যতম শীর্ষ একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে গত আট বছর ধরে শিক্ষকতা করছেন তিনি। ক্লাসে শিক্ষার্থীদের কাছে তিনি দারুণ জনপ্রিয়, আর গবেষণার হাতও চমৎকার। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) নিয়ম অনুযায়ী বেশ কয়েক বছর আগেই তার সহযোগী অধ্যাপক হওয়ার কথা। কিন্তু আজ পর্যন্ত তিনি সহকারী অধ্যাপকই রয়ে গেছেন। অন্যদিকে তারই সহকর্মী আরেকজন শিক্ষক, যার গবেষণার খাতা বলতে গেলে শূন্য, কিন্তু বোর্ড অব ট্রাস্টিজের কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গে নিয়মিত চা-চক্রে অংশ নেন, তিনি ঠিকই পদোন্নতি পেয়ে গেছেন। ড. ফয়সাল জানেনই না, কবে তার পদোন্নতির ফাইলটি আলোর মুখ দেখবে। তার কাছে পদোন্নতি এখন মরুভূমির মরীচিকার মতো, যা কেবল দূর থেকেই দেখা যায়, ছোঁয়া যায় না।
এটি কেবল ফয়সালের একার গল্প নয়—দেশের বেশিরভাগ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের আজ এটাই দৈনন্দিন বাস্তবতা। মেধা, শ্রম আর গবেষণার চেয়ে ক্যাম্পাসের অন্দরমহলে অনেক বেশি দামি হয়ে উঠেছে ‘তেলবাজি’ বা তোষামোদির সংস্কৃতি। একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের পেশাগত জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি ও অনুপ্রেরণা হলো তার গবেষণা এবং যথাসময়ে পদোন্নতি পাওয়া। কিন্তু আমাদের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় এই পদোন্নতির বিষয়টি যেন এক গভীর রহস্যে মোড়া। শিক্ষকরা অন্ধকারে হাতড়ে বেড়ান, কারণ তারা জানেন না কবে তাদের পদোন্নতির জন্য আবেদন করতে হবে, বা আবেদন করলেও কত বছর পর সেটির মূল্যায়ন হবে। বছরের পর বছর ফাইল আটকে থাকে সিন্ডিকেট বা ট্রাস্টি বোর্ডের টেবিলে। যারা প্রশাসনের কর্তাদের মন জুগিয়ে চলতে পারেন, তাদের ফাইল রকেটের গতিতে পাস হয়। আর যারা কেবল পড়ানো আর গবেষণায় মগ্ন থাকেন, তাদের ফাইল ধুলোর আস্তরণে ঢাকা পড়ে যায়।
অথচ এই পুরো প্রক্রিয়ায় একটি সুনির্দিষ্ট নিয়ম থাকার কথা ছিল। উচ্চশিক্ষার তদারকি প্রতিষ্ঠান ইউজিসি পদোন্নতির জন্য সুস্পষ্ট নীতিমালা বেঁধে দিয়েছে। একজন শিক্ষকের কত বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে, কতগুলো আন্তর্জাতিক প্রকাশনা বা পাবলিকেশন থাকতে হবে—সবকিছুই সেখানে বলা আছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এই ইউজিসির নীতিমালাকে কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ রেখেছে। ইউজিসির নিয়ম এখানে কোনো মাপকাঠি নয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিজেদের মতো করে অদ্ভুত সব নিয়ম তৈরি করে। কখনো বলা হয়, ট্রাস্টি বোর্ডের অনুমোদন ছাড়া পদোন্নতি দেওয়া যাবে না, আবার কখনো বা আর্থিক সংকটের খোঁড়া অজুহাত দেখিয়ে বছরের পর বছর শিক্ষকদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়। মেধার মূল্যায়ন এখানে ক্ষমতার অপব্যবহার আর মালিকপক্ষের মর্জির ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
এই অস্বচ্ছ ও বৈষম্যমূলক নীতির কারণে দেশের উচ্চশিক্ষায় এক ভয়াবহ এবং নীরব ধস নামছে। তরুণ ও মেধাবী শিক্ষকরা, যারা নতুন কিছু সৃষ্টির স্বপ্ন নিয়ে শিক্ষকতা পেশায় এসেছিলেন, তারা চরম হতাশায় ভুগছেন। দিনের পর দিন বঞ্চনার শিকার হয়ে অনেক মেধাবী শিক্ষকই শেষ পর্যন্ত দেশ ছেড়ে পাড়ি জমাচ্ছেন। কারণ তারা জানেন, উন্নত বিশ্বে একজন শিক্ষকের মূল্যায়ন হয় তার মেধা আর গবেষণার মাপকাঠিতে, কোনো ট্রাস্টি বোর্ডের কর্তাদের মন-মেজাজের ওপর নয়। যারা নানা পিছুটানের কারণে দেশে থেকে যাচ্ছেন, তারাও একসময় গবেষণার আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। তারা চোখের সামনে দেখছেন, দিন-রাত এক করে গবেষণা প্রবন্ধ লেখার চেয়ে, প্রশাসনের কর্তাদের সাথে সুসম্পর্ক রাখাটা পদোন্নতির জন্য অনেক বেশি কার্যকর একটি কৌশল।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এই লাগামহীন স্বেচ্ছাচারিতা এবং তোষামোদির সংস্কৃতি থেকে শিক্ষাব্যবস্থাকে উদ্ধার করতে হলে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের এখনই অত্যন্ত কঠোর এবং দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে হবে। সবার আগে ইউজিসিকে শুধু নীতিমালা তৈরি করেই বসে থাকলে চলবে না, সেই নীতিমালার কঠোর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বছরে অন্তত দু’বার পদোন্নতির সুনির্দিষ্ট চক্র বা প্রমোশন সাইকেল বাধ্যতামূলক করা এখন সময়ের দাবি। একজন শিক্ষক যোগ্যতা অর্জনের পর তার আবেদন কোনোভাবেই নির্দিষ্ট সময়ের বেশি আটকে রাখা যাবে না। যদি কোনো বিশ্ববিদ্যালয় বাজেটের অজুহাতে বা বিনা কারণে শিক্ষকদের পদোন্নতি আটকে রাখে, তবে ইউজিসিকে সরাসরি সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে আর্থিক জরিমানা বা নতুন শিক্ষার্থী ভর্তির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের মতো শক্ত ব্যবস্থা নিতে হবে।
পদোন্নতির পুরো প্রক্রিয়াটিকে ট্রাস্টি বোর্ডের একক প্রভাব থেকে মুক্ত করতে হবে। এটি করার জন্য প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ অ্যাকাডেমিক কাউন্সিল গঠনের বাধ্যবাধকতা তৈরি করা নীতিনির্ধারকদের অন্যতম দায়িত্ব। এই পদোন্নতি কমিটিতে ইউজিসির একজন নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষক রাখা যেতে পারে, যাতে কোনো যোগ্য শিক্ষককে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বাদ দেওয়া না হয়। মূল্যায়ন প্রক্রিয়া হতে হবে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক। কেন একজন শিক্ষক পদোন্নতি পেলেন এবং কেন আরেকজন পেলেন না, তার সুস্পষ্ট ও লিখিত কারণ সংশ্লিষ্ট শিক্ষককে জানানোর আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি করতে হবে।
এর পাশাপাশি শিক্ষকদের জন্য ইউজিসির অধীনে একটি কেন্দ্রীয় অভিযোগ কেন্দ্র বা গ্রিভ্যান্স রিড্রেস সেল গঠন করা অত্যন্ত জরুরি। কোনো শিক্ষক যদি মনে করেন তিনি যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও বৈষম্যের শিকার হয়েছেন এবং তোষামোদির কারণে অন্য কাউকে অন্যায়ভাবে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে, তবে তিনি যেন নির্ভয়ে সরাসরি ইউজিসির কাছে প্রমাণসহ অভিযোগ জানাতে পারেন। সেই অভিযোগ দ্রুততম সময়ে তদন্ত করে প্রমাণিত হলে ওই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
একটি জাতির ভবিষ্যৎ সরাসরি নির্ভর করে তার শিক্ষকদের যোগ্যতার ওপর। শিক্ষকরাই যদি নিজেদের কর্মক্ষেত্রে এমন চরম বৈষম্য আর অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটান, তবে তারা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে কী শেখাবেন? বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দেশের উচ্চশিক্ষায় বিশাল অবদান রাখছে, এই কথা যেমন সত্য; তেমনি পদোন্নতির নামে সেখানে মেধার বদলে তোষামোদির যে হাট বসেছে, তাও অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। নীতিনির্ধারকদের মনে রাখতে হবে, যোগ্য শিক্ষকদের মূল্যায়ন না করে কেবল চাটুকারদের পুরস্কৃত করলে, একদিন এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে শুধু সনদধারী রোবটই বের হবে, সত্যিকারের কোনো জ্ঞান সৃষ্টি হবে না। জ্ঞানের এই পবিত্র মন্দিরগুলোয় মেধার অবমূল্যায়ন ঠেকাতে এখনই বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নেওয়ার বিকল্প নেই।