সুষম খাদ্য, স্বাস্থ্যকর জীবনধারা ও নিয়মিত ব্যায়ামই দীর্ঘমেয়াদি সুস্থতার চাবিকাঠি
-
- - নিউজ -
- ডেস্ক --
- ৫ জুলাই, ২০২৬
রাজধানীতে প্রকৌশলীদের মধ্যে স্বাস্থ্যসচেতনতা বৃদ্ধি এবং সুস্থ জীবনযাপনের গুরুত্ব তুলে ধরতে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, বাংলাদেশ (আইইবি) সদর দফতরের উদ্যোগে ‘Health & Wellness Seminar-2026: The Science of Lifelong Health: Nutrition and Lifestyle’ শীর্ষক একটি সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে। স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম এবং সচেতন জীবনধারার মাধ্যমে অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ ও কর্মক্ষমতা বৃদ্ধির বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয় এ আয়োজনে।
রোববার (৫ জুলাই) বিকেল সাড়ে ৫টায় আইইবি সদর দফতরের পুরাতন ভবনের সেমিনার কক্ষে আয়োজিত এ সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন আইইবির প্রেসিডেন্ট এবং রাজউকের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মোহাম্মদ রিয়াজুল ইসলাম (রিজু)।
সভাপতির বক্তব্যে তিনি বলেন, বর্তমান সময়ে জীবনযাত্রার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের খাদ্যাভ্যাসেও বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম সকালের নাস্তা কিংবা দৈনন্দিন খাবারের ক্ষেত্রে ফাস্টফুড এবং চিনিযুক্ত কোমল পানীয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। এসব খাদ্যে অতিরিক্ত চিনি, লবণ, ট্রান্সফ্যাট, অস্বাস্থ্যকর চর্বি এবং বিভিন্ন কৃত্রিম উপাদান থাকায় ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, স্থূলতা ও কিডনিসহ বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
তিনি বলেন, সুস্থ শরীর ছাড়া ব্যক্তি, পরিবার কিংবা রাষ্ট্রের উন্নয়ন সম্ভব নয়। একজন প্রকৌশলীর দায়িত্ব শুধু অবকাঠামো নির্মাণে সীমাবদ্ধ নয়; দেশের উন্নয়নের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তাই দীর্ঘমেয়াদি কর্মক্ষমতা ধরে রাখতে স্বাস্থ্যকর ও সুষম খাদ্য গ্রহণের পাশাপাশি নিয়মিত ব্যায়াম ও স্বাস্থ্যসম্মত জীবনধারার অভ্যাস গড়ে তোলার বিকল্প নেই।
অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন আইইবির সম্মানী সহকারী সাধারণ সম্পাদক (প্রশাসন ও অর্থ) প্রকৌশলী মুহাম্মদ আহসানুল রাসেল। তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠার পর থেকেই আইইবি দেশের প্রকৌশলীদের পেশাগত দক্ষতা, প্রযুক্তিগত জ্ঞান এবং নেতৃত্ব বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। বর্তমানে দেশের ১৮টি কেন্দ্র, ৩৪টি উপকেন্দ্র এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পরিচালিত ১৪টি ওভারসিজ চ্যাপ্টারের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি নানা ধরনের প্রশিক্ষণ, সেমিনার, কর্মশালা ও পেশাগত উন্নয়নমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
তিনি আরও বলেন, পেশাগত উন্নয়নের পাশাপাশি প্রকৌশলীদের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করাও আইইবির অন্যতম অঙ্গীকার। সেই চিন্তা থেকেই এবার প্রথমবারের মতো স্বাস্থ্যবিষয়ক একটি বিশেষ সেমিনারের আয়োজন করা হয়েছে। কারণ একজন দক্ষ, সৃজনশীল এবং দায়িত্বশীল প্রকৌশলী গড়ে তুলতে সুস্থ শরীর ও সুস্থ মন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
সেমিনারের মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অধ্যাপক ড. মো. মজিবুল হক, যিনি যুক্তরাষ্ট্রের বায়োলজিক্স–কোয়ান্টাম সেলুলার মেডিসিন (QCM)-এর মেডিকেল কনসালটেন্ট ও ক্লিনিক্যাল রিসার্চ ম্যানেজার এবং ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির ইন্টিগ্রেটিভ মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক।
তিনি বলেন, সুস্বাস্থ্য বলতে শুধু রোগমুক্ত থাকাকে বোঝায় না। প্রকৃত সুস্বাস্থ্য হলো শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক সুস্থতার সমন্বিত একটি পূর্ণাঙ্গ অবস্থা। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, ক্যানসার এবং বিভিন্ন মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা দ্রুত বাড়ছে। এসব অসংক্রামক রোগের বড় একটি অংশই সঠিক খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম এবং স্বাস্থ্যকর জীবনধারা অনুসরণের মাধ্যমে প্রতিরোধ করা সম্ভব।
মূল প্রবন্ধে তিনি আধুনিক জীবনযাপনের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে বলেন, প্রযুক্তিনির্ভর জীবন মানুষের শারীরিক পরিশ্রম কমিয়ে দিয়েছে। একই সঙ্গে অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস, অতিরিক্ত মানসিক চাপ এবং পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব মানুষের সামগ্রিক স্বাস্থ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তাই স্বাস্থ্য রক্ষায় প্রতিদিনের ছোট ছোট ইতিবাচক অভ্যাস দীর্ঘমেয়াদে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
ফাস্টিং বা উপবাস সম্পর্কে তিনি বলেন, এটি মানবসভ্যতার ইতিহাসে বহু শতাব্দী ধরে ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক এবং স্বাস্থ্যগত কারণে অনুসৃত হয়ে আসছে। সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, সঠিক নিয়মে এবং উপযুক্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে ফাস্টিং শরীরের বিপাকীয় কার্যক্রম উন্নত করতে, ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে এবং দীর্ঘমেয়াদি সুস্থতা বজায় রাখতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। তবে ব্যক্তির বয়স, শারীরিক অবস্থা ও চিকিৎসকের পরামর্শ বিবেচনায় রেখে এ ধরনের অভ্যাস অনুসরণ করা উচিত।
তিনি আরও বলেন, সুস্থ জীবনের জন্য নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটা, দৌড়ানো, সাইকেল চালানো কিংবা অন্য কোনো শারীরিক কার্যক্রম হৃদ্যন্ত্রকে সুস্থ রাখে, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে, ওজন কমাতে সহায়তা করে এবং মানসিক চাপ কমিয়ে কর্মক্ষমতা বাড়ায়।
ঘুমের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতিদিন গড়ে সাত থেকে আট ঘণ্টা মানসম্মত ঘুম প্রয়োজন। পর্যাপ্ত ঘুম শরীরের কোষ পুনর্গঠন, স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা উন্নয়ন এবং মানসিক ভারসাম্য বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
সেমিনারে অংশগ্রহণকারী প্রকৌশলীরা বক্তাদের বক্তব্য মনোযোগসহকারে শোনেন এবং স্বাস্থ্যকর জীবনধারা বিষয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন করেন। প্রশ্নোত্তর পর্বে স্বাস্থ্য, পুষ্টি, খাদ্যাভ্যাস, ব্যায়াম এবং কর্মব্যস্ত জীবনে সুস্থ থাকার নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।
অনুষ্ঠানের শেষপর্বে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন আইইবির ভাইস-প্রেসিডেন্ট (এসঅ্যান্ডডব্লিউ) প্রকৌশলী নিয়াজ উদ্দিন ভূঁইয়া। তিনি বলেন, আজকের আলোচনা উপস্থিত সবার জন্য অত্যন্ত সময়োপযোগী ও শিক্ষণীয়। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপক তাঁর গবেষণাভিত্তিক উপস্থাপনার মাধ্যমে সুস্থ জীবনযাপন, সঠিক পুষ্টি, স্বাস্থ্যকর অভ্যাস এবং দীর্ঘমেয়াদি সুস্থতা সম্পর্কে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন। এজন্য তিনি সভাপতি, মূল প্রবন্ধ উপস্থাপক এবং উপস্থিত অতিথিদের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানান।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন আইইবির সম্মানী সহকারী সাধারণ সম্পাদক (এসঅ্যান্ডডব্লিউ) প্রকৌশলী সাব্বির আহমেদ ওসমানী।
সেমিনারে আরও উপস্থিত ছিলেন আইইবির ভাইস-প্রেসিডেন্ট (একাডেমিক ও আন্তর্জাতিক) প্রকৌশলী খান মনজুর মোরশেদ, ভাইস-প্রেসিডেন্ট (প্রশাসন ও অর্থ) প্রকৌশলী এ.টি.এম. তানবীর-উল হসান (তমাল), আইইবি ঢাকা কেন্দ্রের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী হেলাল উদ্দিন তালুকদার, সম্মানী সম্পাদক প্রকৌশলী কে. এম. আসাদুজ্জামান, ভাইস-চেয়ারম্যান (একাডেমিক অ্যান্ড এইচআরডি) প্রকৌশলী আব্দুল্লাহ আল মামুন, কেন্দ্রীয় কাউন্সিলের সদস্যবৃন্দ, বিভিন্ন প্রকৌশল বিভাগের নেতৃবৃন্দ, প্রকৌশল চ্যাপ্টারের প্রতিনিধিসহ বিভিন্ন প্রকৌশল সংগঠনের সদস্যরা।
স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রকৌশলীদের সুস্থ কর্মজীবন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ভবিষ্যতেও এ ধরনের আয়োজন অব্যাহত রাখার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারীরা।