আজ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিরোধ দিবস

আগের দিন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নির্মমভাবে দমনের পর ধারণা করা হচ্ছিল, আন্দোলন হয়তো থেমে যাচ্ছে। তবে তা ভুল প্রমাণ করেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো স্তব্ধ থাকলেও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে কমপ্লিট শাটডাউন সফল করতে নেমে আসেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। ১১ জন শিক্ষার্থী সেদিন শহীদ হন। 

তার পরও পিছু না হটে উত্তরা-আজমপুর, রামপুরা-বাড্ডা, মোহাম্মদপুর-ধানমন্ডির রাজপথ দখলে নেন শিক্ষার্থীরা। তাদের দমাতে হেলিকপ্টার থেকে টিয়ার গ্যাসের শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ছোড়া 

হয়। তবে শিক্ষার্থীদের প্রতিরোধের মুখে তৎকালীন সরকারের পুলিশ পেরে ওঠেনি। রামপুরায় কানাডিয়ান বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটির ছাদ থেকে হেলিকপ্টার করে পালায় তারা। এই দৃশ্য শিক্ষার্থীদের প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে ওঠে। এর স্মরণে আজ ১৮ জুলাই পালিত হবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিরোধ দিবস। চব্বিশের ১৮ জুলাই প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি স্টুডেন্টস অ্যালায়েন্স অব বাংলাদেশ (পুসাব) ঢাকার রাজপথে আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয়। 

সেদিন সকাল থেকে রাজপথ অবরোধ করেন শিক্ষার্থীরা। তাদের দমনে পুলিশের সঙ্গে অস্ত্র হাতে নামে ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। উঁচু ভবনের ছাদ থেকে স্নাইপার দিয়ে গুলি ছোড়া হয়। সেগুলো কেনা হয়েছিল ২০১৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে। স্নাইপারের গুলিতে উত্তরায় শহীদ হন বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের সাবেক শিক্ষার্থী মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ। তিনি টিয়ার গ্যাসের শেলের ধোঁয়ার যন্ত্রণায় কাতর শিক্ষার্থীদের মধ্যে পানি বিতরণ করছিলেন। তাঁর মৃত্যুর আগের মুহূর্তে বলা ‘পানি লাগবে পানি’ ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশে। 

জ্বলে ওঠে ক্ষোভের আগুন। তা ঠেকাতে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার সারাদেশে ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয়। প্রথমে মোবাইল ইন্টারনেট এবং রাতে বন্ধ করা হয় ব্রডব্যান্ড সেবাও। সারাদেশ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এক দিনে ৩৭ জন শহীদ হন। ২০১৩ সালের পর ১১ বছরে এক দিনে রাজপথে এত মৃত্যু দেখেনি দেশ।

আগের রাতে দখল করা যাত্রাবাড়ী, সাইনবোর্ড, শনির আখড়ার রাজপথ ১৮ জুলাইয়েও দখলে রাখে ছাত্রদের পাশে নামা সাধারণ মানুষ। মোহাম্মদপুর থেকে বেড়িবাঁধ হয়ে বছিলা পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে রাজপথে নামেন মা-বাবারাও। তাদের ওপর গুলি চালানোর অভিযোগ রয়েছে আওয়ামী লীগের তৎকালীন ওয়ার্ড কাউন্সিলর আসিফ আহমেদসহ দলটির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে।

সেদিন রাজধানী ঢাকাসহ দেশের অন্তত ৪৭টি জেলায় পুলিশ, র‍্যাব, বিজিবি এবং ক্ষমতাসীন দলের অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের সঙ্গে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের দফায় দফায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়। একের পর এক প্রাণহানি হলেও টেলিভিশনের খবরে তা ছিল না, সরকারি কঠোর বিধিনিষেধে। সেদিন দুপুরে বিটিভি কার্যালয়ে আগুন দেওয়া হয়। 

সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আগের রাতে হল খালি করার নির্দেশের পর সেদিন ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিসহ বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাজার হাজার শিক্ষার্থী রাস্তায় নেমে আসেন। সেদিন শিক্ষার্থীদের ওপর গুলি চালানো হয়। ধানমন্ডিতে ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী ফারহান ফাইয়াজকে হত্যা করা হয়। 

পরিস্থিতি বেগতিক দেখে দুপুরের দিকে তৎকালীন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ও শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল আলোচনার প্রস্তাব দেন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়করা তা প্রত্যাখ্যান করেন। তারা সাফ জানিয়ে দেন, রক্তের বিচার ছাড়া সংলাপ হবে না। 

রাজধানীর বাইরে চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, নরসিংদী, মাদারীপুর ও সিলেট থেকে তীব্র সংঘর্ষের খবর আসে। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন কোটবাড়ী বিশ্বরোডে পুলিশ ও শিক্ষার্থীদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ায় পরিস্থিতি রণক্ষেত্রে রূপ নেয়, যেখানে পুলিশের একাধিক গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে।

এদিন ঢাকায় শহীদ হন নর্দান ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের শিক্ষার্থী আসিফ হাসান, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ইরফান ভূঁইয়া, মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির পারভেজ শাকিল, ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির জাহিদুজ্জামান তানভীন, ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির  আল হামীম সায়মন, সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটির রাব্বী মিয়া, ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটির আসিফ ইকবাল, সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটির ইমতিয়াজ আহমেদ জাবির। 

মিরপুরের মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির শিক্ষার্থী শাইখ আসহাবুল ইয়ামিনের শহীদ হওয়ার নির্মম ঘটনাটি সারাদেশকে নাড়িয়ে দেয়। পুলিশের রায়ট কার থেকে শিক্ষার্থীদের ওপর গুলি চালালে প্রতিরোধের চেষ্টা করেন ইয়ামিন। তিনি গাড়িতে উঠে পড়লে, সেখানেই তাকে গুলি করা হয়। গুরতর আহত অবস্থায় তাঁকে রায়ট কার থেকে সড়কে ফেলে দেওয়া হয়। তখনও তিনি জীবিত ছিলেন। ওই অবস্থায় তাঁকে হাসপাতালে না নিয়ে কয়েকজন পুলিশ উঁচু করে ধরে চার ফুট উচ্চতার সড়ক বিভাজক থেকে ফেলে হত্যা করে। 

সেদিনই সরকার জানায়, কোটা পুনর্বহালে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে দুই দিন পর ২১ জুলাই আপিলের শুনানি হবে হবে। আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘বিএনপি-জামায়াতের প্রশিক্ষিত ক্যাডার বাহিনী সারাদেশে এই তাণ্ডব চালাচ্ছে। তাদের উস্কানির জন্য সারাদেশে কয়েকজনকে প্রাণ দিতে হয়েছে।’

পাঠকের মন্তব্য