বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শত কোটি টাকার কর ফাঁকি, নজরদারিতে এনবিআর

ক্লিনিং থেকে ক্যাটারিং, পরামর্শক ফি থেকে কারিগরি ফি, মিটিং থেকে প্রশিক্ষণ, গাড়ি ভাড়া থেকে মেরামত— বিভিন্ন খাতে উৎসে কর কর্তনের বিধান রয়েছে; কিন্তু দেশে বেড়ে চলা অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এসব খাতে উৎসে কর কর্তন করছে না। অনেক বিশ্ববিদ্যালয় নিয়মিত আয়কর রিটার্নও দাখিল করে না। আবার কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের ই-টিআইএনও নেই।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আয়কর ও উৎসে কর ফাঁকি উদ্ঘাটনে নজর দিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এজন্য দেশের ১০৪টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকা করে তা তদন্তের জন্য কর অঞ্চলগুলোতে পাঠানো হয়েছে। এনবিআর বলছে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আয় করলেও বিপুল পরিমাণ ব্যয় দেখায়। এসব ব্যয়ের বেশিরভাগই উৎসে কর কর্তনযোগ্য। ফলে শুধু উৎসে কর যথাযথভাবে মনিটরিং করা হলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে বছরে শত শত কোটি টাকা কর আদায় সম্ভব।

এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ই-টিআইএন ও রিটার্ন দাখিলের তথ্য যাচাই করতে কর অঞ্চলগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে উৎসে কর কর্তনের বিষয়েও নজরদারি বাড়াতে বলা হয়েছে।

উৎসে কর বিধিমালা অনুযায়ী, ক্লিনিং, ক্যাটারিং, উপদেষ্টা বা পরামর্শক ফি, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট, প্রশিক্ষণ, কুরিয়ার সার্ভিস, মিটিং বা প্রশিক্ষণ ফি, পরিবহন সেবা, গাড়ি ভাড়া, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ, ইন্টারনেট সেবা, জনবল সরবরাহ, নিরাপত্তা এবং আইনি সেবাসহ অন্তত ৫০ থেকে ৫৫টি খাতে উৎসে কর রয়েছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এসব সেবা গ্রহণ করলেও অনেক ক্ষেত্রে উৎসে কর কর্তন করে না বলে অভিযোগ রয়েছে। কিছু বিশ্ববিদ্যালয় কর কর্তন করলেও তা নামমাত্র।

এনবিআর থেকে কর অঞ্চলগুলোতে পাঠানো তালিকা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ই-টিআইএন থাকলেও ১২টি বিশ্ববিদ্যালয় কখনও আয়কর রিটার্ন দাখিল করেনি। এগুলো হলো— ট্যাগোর ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ আর্টস ট্রাস্ট, শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব ইউনিভার্সিটি (পরে নাম পরিবর্তন করে ব্রহ্মপুত্র ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি), এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন, বান্দরবান বিশ্ববিদ্যালয়, জার্মান ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, সিসিএন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ আর্মি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, বাংলাদেশ আর্মি ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি, বরিশাল ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি, ফার্স্ট ক্যাপিটাল ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, লালন বিজ্ঞান ও কলা বিশ্ববিদ্যালয়, টাইমস ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, কক্সবাজার ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি এবং তিস্তা ইউনিভার্সিটি।

এসব বিশ্ববিদ্যালয়কে সংশ্লিষ্ট কর অঞ্চল থেকে রিটার্ন দাখিলের জন্য নোটিশ দেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এছাড়া আটটি বিশ্ববিদ্যালয় এখনও ই-টিআইএন নেয়নি। সেগুলো হলো— এনপিআই ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, রাজশাহী সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি ইউনিভার্সিটি, আহ্ছানিয়া মিশন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, শাহ মখদুম ম্যানেজমেন্ট ইউনিভার্সিটি, ঈশা খাঁ ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, শেখ হাসিনা ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (পরিবর্তিত নাম ডা. মমতাজ বেগম ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি), জাস্টিস আবু জাফর সিদ্দিকী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং ব্রিটানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়।

এসব বিশ্ববিদ্যালয়কে ই-টিআইএন নিবন্ধন ও আয়কর নথি দাখিল করতে সংশ্লিষ্ট কর অঞ্চল থেকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ করবর্ষের পর ১৭টি বিশ্ববিদ্যালয় রিটার্ন দাখিল করেনি। এগুলো হলো— আশা ইউনিভার্সিটি, বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজি, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজি, ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি, গ্রিন ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব হেলথ সায়েন্সেস ট্রাস্ট, প্রাইম এশিয়া ইউনিভার্সিটি, শান্ত মারিয়াম ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজি, স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক, দি পিপলস ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, লিডিং ইউনিভার্সিটি, ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটি চিটাগাং, এক্সিম ব্যাংক কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ইউনিভার্সিটি অব গ্লোবাল ভিলেজ এবং খুলনা খান বাহাদুর আহ্ছানউল্লাহ বিশ্ববিদ্যালয়।

এসব বিশ্ববিদ্যালয়কে রিটার্ন দাখিলের জন্য কর অঞ্চল থেকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে।

এছাড়া ২০২৩-২৪ করবর্ষের পর ছয়টি বিশ্ববিদ্যালয় আর রিটার্ন দাখিল করেনি। এগুলো হলো— অতীশ দীপঙ্কর ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস এগ্রিকালচার অ্যান্ড টেকনোলজি, প্রাইম এশিয়া ইউনিভার্সিটি, আর পি সাহা বিশ্ববিদ্যালয় এবং বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়।

২০২২-২৩ করবর্ষের পর ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অলটারনেটিভ ও বাংলাদেশ আর্মি ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি রিটার্ন দাখিল করেনি। ২০২১-২২ করবর্ষের পর সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিও রিটার্ন দাখিল করেনি।

এছাড়া ২০২০-২১ করবর্ষের পর দ্য মিলেনিয়াম ইউনিভার্সিটি, স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, নর্দান ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি চিটাগং, বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ এবং ফেনী ইউনিভার্সিটি আর রিটার্ন দাখিল করেনি।

অন্যদিকে ২০১৬-১৭ করবর্ষের পর নর্থ ইস্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, নর্দান ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজি, বাংলাদেশ ইসলামী ইউনিভার্সিটি এবং ফারইস্ট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি রিটার্ন দাখিল করেনি। ২০০৯-১০ করবর্ষের পর ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ রিটার্ন জমা দেয়নি। এছাড়া ২০২৫-২৬ করবর্ষে ৪৩টি বিশ্ববিদ্যালয় রিটার্ন দাখিল করেনি।

একাধিক কর কমিশনার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এনবিআর থেকে তালিকা দেওয়ার আগেও বেশির ভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিষয়ে কর অঞ্চলগুলো কাজ করছিল। তবে এনবিআরের দেওয়া তালিকা অনুযায়ী, যেসব বিশ্ববিদ্যালয় নির্দিষ্ট করবর্ষে রিটার্ন দেয়নি, তাদের আয়কর আইন, ২০২৩-এর ২৮০ ধারায় নোটিশ দেওয়া হয়েছে। যারা ই-টিআইএন নেয়নি, তাদের ই-টিআইএন নেওয়া ও রিটার্ন দাখিল করতে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে ২১২ ধারায় রিটার্ন জমা দিতে বলা হয়েছে।
এছাড়া উৎসে কর আদায়ে জোর দেওয়া হয়েছে। উৎসে কর ফাঁকি রোধে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বার্ষিক প্রতিবেদন, ব্যাংক হিসাব ও ব্যয়ের খাত কঠোরভাবে যাচাই করা হচ্ছে। মনিটরিং জোরদার করায় কর আদায় বাড়বে বলে মনে করেন এসব কর্মকর্তা।

এ বিষয়ে এনবিআরের সদস্য (কর জরিপ ও পরিদর্শন) মো. রফিকুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘আমরা মাঠে তালিকা পাঠিয়েছি। কর অঞ্চলগুলো কাজ শুরু করেছে। আশা করি ভালো রেসপন্স পাওয়া যাবে।’

তিনি বলেন, ‘কর অঞ্চলগুলো শুধু উৎসে কর মনিটরিং করলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে শত শত কোটি টাকা কর আদায় সম্ভব। কঠোর পদক্ষেপ নিতে এনবিআর থেকে আমরা নির্দেশনা দিয়েছি।’

পাঠকের মন্তব্য