শিশু কিশোরদের ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়া
-
- - নিউজ -
- ডেস্ক --
- ৩ মে, ২০২৬
অদিতি করিম:
আমাদের শিশু কিশোররা এখন এক ভয়াবহ সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। শিশুদের বিকাশে এখন সবচেয়ে বড় বাধার নাম সোশ্যাল মিডিয়া। ছোট শিশুদের হাতে আমরা বইয়ের বদলে তুলে দিচ্ছি স্মার্ট ডিভাইস। শিশুরা আসক্ত হয়ে পড়ছে মোবাইলে। যা খুশি দেখতে পারছে অবাধে। লেখাপড়ার বদলে সারাক্ষণ তাদের চোখ ডিভাইসে।
এটা একদিকে যেমন তার মানসিক বিকাশের উপর প্রভাব ফেলছে অন্যদিকে তার নানা রকম শারীরিক সমস্যা দেখা দিচ্ছে। কিশোর বয়সে এসে মোবাইল তাকে মাদকে আসক্ত করছে, কিশোরদের প্রলুব্ধ করছে সহিংসতায়।
মোবাইল ডিভাইসে অশ্লীল কনটেন্ট দেখে কিশোররা ইভ টিজিংয়ের মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। একসময় কিশোর বয়সেই তারা ফেসবুক আর টিকটকের কারণে হয়ে যাচ্ছে কিশোর গ্যাং। এভাবেই একটার পর একটা প্রজন্ম চলে যাচ্ছে বিপথে। সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে ধ্বংস হচ্ছে আমাদের শিশু কিশোরদের সুন্দর ভবিষ্যৎ।
‘আধিপত্য বিস্তার নিয়ে কিশোর গ্যাংয়ের হামলা’ এ রকম ঘটনার খবর আমরা হরহামেশাই শুনে থাকি। হামলায় কিশোর নিহতের খবরও নতুন নয়। প্রতিটি হামলার ঘটনায় থাকছে সর্বনিন্ম ৩০-৪০ জনের একটি সংবদ্ধ কিশোর দল।
কোথায়ও কোথাও হামলায় শতাধিক কিশোরও দেখা যায়। কিন্তু প্রশ্ন মুহূর্তে এত কিশোর এক সাথে জোর হচ্ছে কিভাবে? এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই বেরিয়ে এলো ভয়ংকর তথ্য! কিশোর অপরাধ বৃদ্ধির একটি বড় কারণ তথ্য-প্রযুক্তির অপব্যবহার। প্রত্যেক হামলার পেছনেই ব্যবহার হচ্ছে তথ্য-প্রযুক্তি।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক, ম্যাসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ কিংবা ইমুতে গ্রুপ খুলে তারা তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তাই মুহূর্তেই খবর পৌঁছে যাচ্ছে বিভিন্ন স্থানে থাকা গ্রপের অন্য সদস্যদের নিকট। যার ফলে স্বল্প সময়ের ব্যবধানে তারা এক জায়গায় জড়ো হয়ে হামলা, ভাঙচুর ও খুনের মত ঘটনা ঘটাচ্ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম উন্মুক্ত ও নিয়ন্ত্রণহীন প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে। সেখানে নানা ধরনের আচরণ ও কার্যকলাপ শিশুদের নিরাপত্তা ও কল্যাণের জন্য ক্ষতিকর। প্রতারণা ও হয়রানি ঝুঁকির পাশাপাশি শিশুরা অনলাইন বুলিংয়েরও শিকার হয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অবাধ ব্যবহারের আরেকটি চিন্তার বিষয় হলো অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম। বিশেষভাবে উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব অ্যাপ এমনভাবে তৈরি করা হয় যাতে ব্যক্তিগত
অ্যালগরিদমের মাধ্যমে ব্যবহারকারীর মনোযোগ সর্বোচ্চ সময় ধরে রাখা যায়। ফলে সব বয়সের ব্যবহারকারীই দীর্ঘ সময় ডিভাইসে কাটাতে বাধ্য হন। শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে এটি বাজে ফলাফল, ঘুমের অভাব এবং সামাজিক যোগাযোগ কমে যাওয়ার কারণও হতে পারে।
এই সমস্যাটা শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, সারাবিশ্বে শিশু কিশোরদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া এখন সবচেয়ে বিপজ্জনক পথ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ একারণেই শিশু কিশোরদের জন্য ফেসবুক, টিকটক, ইউটিউবের মতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার নিষিদ্ধ বা সীমিত করেছে।
যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স ,ডেনমার্কের, স্পেন, অস্ট্রেলিয়াসহ বিশ্বের অনেক দেশশিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে বিধিনিষেধের ঘোষণা দিয়েছে। গত বছরের ১০ ডিসেম্বর বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে অস্ট্রেলিয়া ১৬ বছরের কমবয়সীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নিষিদ্ধ করে। যুক্তরাজ্যও এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়টি বিবেচনা করছে।
দেশটির পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ হাউস অব লর্ডস ২১ জানুয়ারি ১৬ বছরের কম বয়সী শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নিষিদ্ধ করার পক্ষে ভোট দেয়। বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের সরকারের ওপর অস্ট্রেলিয়ার মতো কঠোর হতে মারাত্মক চাপ তৈরি করেছে। অন্যদিকে ১৫ বছরের নিচে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে ফ্রান্স ও ডেনমার্কও বিধিনিষেধ আরোপের ঘোষণা দিয়েছে।
নরওয়ে বর্তমান বিধিনিষেধগুলো কাজ করছে না বলে স্বীকার করেছে। দেশটি আরও কার্যকর তদারকি ব্যবস্থা তৈরির কাজ করছে। চীন শিশুদের জন্য সবচেয়ে কঠোর ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাগুলোর একটি প্রয়োগ করে। ১৪ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য দৈনিক স্ক্রিনটাইম ৪০ মিনিটে সীমাবদ্ধ করেছে। তাদের জন্য স্থানীয় সময় রাত ১০টা থেকে পরদিন সকাল ৬টা পর্যন্ত ডিজিটাল প্রবেশাধিকার সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রে ফেসবুক, টিকটক ও ইউটিউবের বিরুদ্ধে শিশু ও কিশোরদের মানসিক ক্ষতির অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়েছে। লস অ্যাঞ্জেলসে গত ২৬ জানুয়ারি এই মামলাটি দায়ের হয়, যেখানে এই তিন জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্মের মূল প্রতিষ্ঠান মেটা, অ্যালফাবেট ও বাইটড্যান্সের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে যে তারা শিশুদের সোশ্যাল মিডিয়ায় আসক্ত করে তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি করছে। মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে, সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলো এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যা ব্যবহারকারীদের মনোযোগ ধরে রাখে এবং মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর কনটেন্ট প্রচার করে। বাদী পক্ষ বলছে, প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের প্ল্যাটফর্মের এলগরিদম এমনভাবে তৈরি করেছে যা শিশুদের আসক্ত করে ফেলে।
বৈশ্বিক এই উদ্যোগগুলো এ কথা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে যে ক্ষতি হচ্ছে, তার পুরো দায় শুধু মা–বাবার ওপর দেওয়া সঠিক নয়; বরং যেসব সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম শিশুদের মনোযোগ ধরে রাখার বিনিময়ে কাঁড়ি কাঁড়ি অর্থ আয় করছে, এ ক্ষতির দায় তাদেরও বহন করতে হবে।
একসময় ভাবা হতো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে শিশু-কিশোরদের ওপর বাবা-মা ঠিকভাবে নজর রাখলেই সমস্যা হবে না; কিন্তু এখন অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, নরওয়ে, তুরস্কসহ অনেক দেশেই সরকারগুলো বলছে, শুধু অভিভাবকের তদারকিই যথেষ্ট নয়। এর মানে এটা নয় যে অভিভাবক হিসেবে মা–বাবা বা সরকার দায়মুক্ত। শিশুদের সুরক্ষায় পরিবার অনস্বীকার্য। ভূমিকা রয়েছে রাষ্ট্রেরও। তবে এখন স্পষ্ট হচ্ছে যে শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তার দায় সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানিগুলো এড়াতে পারে না।
আমাদের দেশের অনেক অভিভাবক শিশুদের আবদারপূরণ ও ‘বিরক্ত করা’ থেকে বাঁচতে শিশুদের হাতে মুঠোফোন তুলে দেন। অনেক সময় তাদের খাওয়ানো কঠিন হয়ে পড়ে। এসব ‘ঝামেলা’র শর্টকাট সমাধানের জন্য মুঠোফোন হাতে তুলে দেওয়াই স্বস্তিকর। এটি হয়তো সাময়িক একটি সমাধান; কিন্তু এটিই শিশু-কিশোরের মারাত্মক আসক্তি তৈরির সুযোগ করে দেয়। যা তাকে ভবিষ্যতে এমন একটি জালে আটকে দেয়, যেখান থেকে বের হওয়া অত্যন্ত কঠিন। এই ডিজিটাল জগৎ তাদের জন্য যতটা আকর্ষণীয়, ততটাই ঝুঁকিপূর্ণ। উদ্বেগ, বিষণ্নতা, ঘুমের সমস্যা, আসক্তি—এসব এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। প্রশ্ন হলো, এই ক্ষতির দায় কার? এক্ষেত্রে অভিভাবকদের একা দাঁড় করানো বাস্তবসম্মত নয়। একটি পরিবার কীভাবে ট্রিলিয়ন ডলারের অ্যালগরিদমের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করবে?
সারাবিশ্ব শিশুদের সুরক্ষার জন্য কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে একেবারেই উদাসীন। সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশের তথ্য বলছে, ক্রমবর্ধমান কিশোর অপরাধের অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়া। সম্প্রতি বাল্যবিবাহ নিয়ে কাজ করা একটি উন্নয়ন সংস্থার গবেষণায় উঠে এসেছে যে, সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে বাল্যবিবাহ বেড়েছে। অন্য একটি গবেষণায় দেখা গেছে, সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে নারী বিশেষ করে কিশোরীদের উপর যৌন নিপীড়নের ঘটনা বাড়ছে। কিশোরদের প্রেমের ফাঁদে ফেলে তাদের অশ্লীল ভিডিও করে ব্ল্যাকমেইল করার ঘটনা বেড়েছে উদ্বেগজনক হারে।
গণমাধ্যমের খবর বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত বছরে সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে অন্তত ২০৯টি। আমাদের শিশু কিশোরদের বই পড়ার অভ্যাস কমে গেছে। তাদের মনোসংযোগ নষ্ট হয়েছে। প্রতিনিয়ত সোশ্যাল মিডিয়া কেড়ে নিচ্ছে আমাদের শিশু কিশোরদের জীবনী শক্তি। এই বিষয়টি আমরা যত উপেক্ষা করবো, সমস্যা ততই ঘনীভূত হবে। তাই এক মুহূর্ত দেরি না করে এখনই সোশ্যাল মিডিয়াকে শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে হবে। এটাই হওয়া উচিত সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার।
লেখক: লেখক ও নাট্যকার
ইমেইলঃ auditekarim@gmail.com