জুলাই থেকে দাম বাড়ছে আমদানি করা স্মার্টফোনের: চাঙ্গা হবে অবৈধ ফোনের বাজার

বাংলাদেশের গ্রাহকদের জন্য আমদানি করা স্মার্টফোন সস্তা করার লক্ষ্যে দেওয়া সরকারের একটি অস্থায়ী কর ছাড়ের মেয়াদ শেষ হতে চলেছে। এর ফলে আগামী জুলাই মাস থেকে দেশের বাজারে হ্যান্ডসেটের দাম তীব্রভাবে বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, হঠাৎ দামের এই বড় উল্লম্ফন বৈধভাবে ফোন আমদানিতে ধস নামাতে পারে এবং সাধারণ ক্রেতাদের দেশের ক্রমবর্ধমান কালোবাজার বা ‘গ্রে মার্কেটের’ দিকে ঠেলে দিতে পারে।

জানুয়ারির গেজেট ও শুল্কের সমীকরণ
এই বাজার অনিশ্চয়তার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে জারি করা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) একটি গেজেট বিজ্ঞপ্তি। ওই বিজ্ঞপ্তিতে ৩০ জুন পর্যন্ত আমদানি করা স্মার্টফোনের ওপর কাস্টমস ডিউটি বা শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছিল। শিক্ষা, ব্যাংকিং, ফ্রিল্যান্সিং এবং যোগাযোগের জন্য স্মার্টফোন ক্রমশ অপরিহার্য হয়ে ওঠায় ডিজিটাল ডিভাইসগুলোকে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আনতেই সরকার এই সাময়িক পদক্ষেপ নিয়েছিল।

এই বিশেষ ছাড়ের ফলে আমদানি করা হ্যান্ডসেটের ওপর সামগ্রিক করের বোঝা আগের প্রায় ৬২ শতাংশ থেকে কমে প্রায় ৪৩.৪৩ শতাংশে নেমে আসে। কিন্তু আগামী ৩০ জুন এই ছাড়ের মেয়াদ শেষ হতে যাচ্ছে। শিল্পখাতের পূর্বাভাস অনুযায়ী, নতুন অর্থবছরে এই ছাড়ের মেয়াদ আর না বাড়লে এবং নিয়ন্ত্রক শুল্ক (Regulatory Duty) ৩ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫ শতাংশ করা হলে সামগ্রিক করের বোঝা প্রায় ৬৪ থেকে ৬৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।

এই পরিবর্তন কার্যকর হলে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার অঞ্চলের মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ মোবাইল ফোন কর ব্যবস্থার দেশ হিসেবে চিহ্নিত হবে। শিল্পখাতের অংশীদাররা সতর্ক করেছেন যে, এই পদক্ষেপ দাম বাড়ানোর পাশাপাশি বৈধ উপায়ে আনুষ্ঠানিক আমদানি এবং ফলস্বরূপ, সরকারের রাজস্ব সংগ্রহকে মারাত্মকভাবে দুর্বল করে দিতে পারে।

সাধারণ ক্রেতার পকেটে টান
চলমান অস্থায়ী শুল্ক কাঠামোর অধীনে, দেশের বাজারে ৩০,০০০ টাকার বেশি দামের আমদানি করা স্মার্টফোনের দাম প্রায় ৫,৫০০ টাকা পর্যন্ত কমে গিয়েছিল। বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির বাজারে পারিবারিক বাজেটের ওপর চাপ কমিয়ে সাধারণ মানুষের ডিজিটাল সেবার সুযোগ সম্প্রসারণে এটি বড় ভূমিকা রেখেছিল। কিন্তু জুলাই থেকে করের হার আগের অবস্থায় ফিরে গেলে প্রতিটি ফোনে ক্রেতাকে আগের চেয়ে অন্তত ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা বেশি গুনতে হতে পারে।

উচ্চ শুল্কের এই আশঙ্কায় দেশের আমদানিকারক ও পরিবেশকরা চরম শঙ্কিত। তাদের মতে, বাজার মূল্যবৃদ্ধি, সরকারি চ্যানেলে আমদানি হ্রাস এবং অবৈধ পথে বেসরকারি বাণিজ্য প্রসারের এক পরিচিত দুষ্ট চক্রের সম্মুখীন হতে যাচ্ছে দেশের প্রযুক্তি খাত।

সংকুচিত হবে বৈধ বাজার ও বিক্রয়োত্তর সেবা
শিল্প নির্বাহীরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, আনুষ্ঠানিক আমদানির জন্য বাণিজ্যিক প্রণোদনা বা লাভ কমে যাওয়ায় অনুমোদিত পরিবেশকদের মাধ্যমে বাজারে আসা ফোনের মডেলের সংখ্যা বা বৈচিত্র্য সংকুচিত হতে পারে। এটি একদিকে যেমন ভোক্তাদের পছন্দের সুযোগ কমিয়ে দেবে, অন্যদিকে বৈধ ডিস্ট্রিবিউটরদের ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন হওয়ায় ব্র্যান্ডগুলোর অফিশিয়াল বিক্রয়োত্তর সেবা (Warranty & After Sales Service) নেটওয়ার্ক ভেঙে পড়বে। একটি বৃহত্তর ধূসর বা কালোবাজার গড়ে উঠলে সরকারের পক্ষে কর আদায় করা আরও কঠিন হবে এবং মূল্যের স্বচ্ছতা হারিয়ে যাবে।

রাজস্ব বনাম ডিজিটাল অর্থনীতি: ভারসাম্য রক্ষার চ্যালেঞ্জ
এই কর বাড়ানোর বিতর্কটি এমন এক সময়ে সামনে এসেছে যখন সরকার আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রায় ৬ লক্ষ কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের এক বিশাল লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আসবে আমদানি শুল্ক থেকে।

তবে অর্থনীতিবিদ এবং শিল্পখাতের বিশেষজ্ঞরা যুক্তি দিচ্ছেন যে, উচ্চ কর হার মানেই উচ্চ রাজস্ব আদায় নয়। যদিও কাগজে-কলমে আমদানিকৃত পণ্যের ওপর করের হার বাড়তে দেখা যাবে, কিন্তু বাস্তবে আনুষ্ঠানিক আমদানির পরিমাণ কমে গেলে এবং বাণিজ্যের একটি বড় অংশ চোরাই পথে অফিশিয়াল চ্যানেলের বাইরে চলে গেলে সামগ্রিক করের ভিত্তিই সংকুচিত হয়ে পড়বে। দিনশেষে সরকার রাজস্ব হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে।

বর্তমানে দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষের জন্য মোবাইল ব্যাংকিং, ফ্রিল্যান্সিং, ই-কমার্স, অনলাইন শিক্ষা এবং সরকারি পরিষেবা পাওয়ার প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছে স্মার্টফোন। হ্যান্ডসেটের দামে এমন আকস্মিক বৃদ্ধি ডিজিটাল প্রযুক্তির প্রসারকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে এবং ক্রয়ক্ষমতার ব্যবধান বাড়িয়ে দিতে পারে। বিশেষ করে তরুণ ব্যবহারকারী এবং নিম্ন-আয়ের জনগোষ্ঠী, যারা মোবাইল সংযোগের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল, তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।

ফলে, জুনের পর স্মার্টফোনের ওপর কর আরোপের বিষয়ে সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কী হবে, তা দেশের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং ভোক্তা উভয় পক্ষই নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। এর প্রভাব শুধু হ্যান্ডসেটের দামের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং তা দেশের রাজস্ব আদায়, ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি এবং বাংলাদেশের সামগ্রিক ডিজিটাল অর্থনীতির ভবিষ্যৎ গতিপথকেও প্রভাবিত করবে।

পাঠকের মন্তব্য