সার্টিফিকেট নাকি গবেষণা? বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফান্ডিং সংকট ও ইউজিসির কড়াকড়ি
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা খাতের বাজেট নিয়ে বেশ কিছু দিন যাবত আলোচনা চলছে। চলমান আলোচনায় এবার প্রশ্ন উঠেছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণায় বাজেট নিয়ে। বাংলাদেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণায় বাজেট বা বরাদ্দ নিয়ে গত কয়েক বছর ধরে বেশ আলোচনা চলছে। বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভূমিকা দিন দিন বাড়ছে। তবে কেবল শিক্ষার্থী পড়ানো বা সার্টিফিকেট দেওয়ার বাইরে 'নতুন জ্ঞান তৈরি' বা গবেষণার ক্ষেত্রে এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবদান এবং ব্যয় নিয়ে একটি মিশ্র চিত্র দেখা যায়।
গবেষণায় ব্যয়ের চরম বৈষম্য
দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা ব্যয়ের দিকে তাকালে একটি বড় ধরনের বৈষম্য বা ভারসাম্যহীনতা চোখে পড়ে। সব বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণায় সমানভাবে অংশ নেয় না।
শীর্ষস্থানীয়দের বিপুল বিনিয়োগ: ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি এবং ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ-এর মতো হাতেগোনা কয়েকটি শীর্ষ সারির বিশ্ববিদ্যালয় প্রতি বছর তাদের বাজেটের একটি বড় অংশ গবেষণায় ব্যয় করে। কোনো কোনো বছর গবেষণায় দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সম্মিলিত ব্যয়ের চেয়েও এই কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যয় বেশি হতে দেখা গেছে।
বাকিদের উদাসীনতা: এই উজ্জ্বল চিত্রের পেছনে একটি অন্ধকার দিকও রয়েছে। ইউজিসির তথ্য অনুযায়ী, দেশে অনুমোদিত শতাধিক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ২৫ থেকে ৩০টিরও বেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা খাতে কোনো বরাদ্দই থাকে না। অনেক বিশ্ববিদ্যালয় নামমাত্র ৫,০০০ থেকে ৪০,০০০ টাকা বার্ষিক গবেষণা ব্যয় দেখায়, যা উচ্চশিক্ষার মানের সঙ্গে একেবারেই বেমানান।
অর্থায়নের উৎস ও বৈশ্বিক কোলাবরেশন
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেখানে সরাসরি সরকারি বাজেট বা ইউজিসির অনুদানের ওপর নির্ভরশীল, সেখানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ফান্ডিং মেকানিজম ভিন্ন।
নিজস্ব তহবিল ও টিউশন ফি: শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিক্ষার্থীদের টিউশন ফির একটি নির্দিষ্ট অংশ গবেষণার জন্য পুনঃবিনিয়োগ করে।
আন্তর্জাতিক অনুদান: ভালো মানের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার যেমন: বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন, বিশ্বব্যাংক বা বিভিন্ন বৈশ্বিক গবেষণা সংস্থার সঙ্গে যৌথ অংশীদারিত্ব বা কোলাবরেশনের মাধ্যমে বড় অঙ্কের বিদেশি ফান্ড নিয়ে আসে।
আন্তর্জাতিক প্রকাশনা ও আউটপুট
গবেষণায় ব্যয়ের ইতিবাচক প্রভাব দেখা যাচ্ছে আন্তর্জাতিক স্কোপাস (Scopus) ইনডেক্সড জার্নালের প্রকাশনাগুলোতে। প্রতি বছর বাংলাদেশের গবেষকদের মোট বৈজ্ঞানিক প্রকাশনার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আসছে শীর্ষ ৫-১০টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। বিশেষ করে কম্পিউটার সায়েন্স, ইঞ্জিনিয়ারিং, এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স এবং বিজনেস স্টাডিজ বিষয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বেশ এগিয়ে রয়েছেন।

প্রধান চ্যালেঞ্জসমূহ
বেসরকারি খাতে গবেষণার পরিধি কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে না পৌঁছানোর পেছনে কিছু বড় কারণ রয়েছে:
শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ: অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কেবল ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে পরিচালিত হয়। তাদের মূল লক্ষ্য থাকে কম খরচে বেশি শিক্ষার্থী ভর্তি করানো, ফলে ল্যাব উন্নয়ন বা গবেষণায় বিনিয়োগ তাদের অগ্রাধিকার তালিকায় থাকে না।
সরকারি বরাদ্দের অভাব: পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সরকারের কাছ থেকে সরাসরি গবেষণা অনুদান পেলেও, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য সরকারি সাধারণ বাজেটে কোনো নিয়মিত বরাদ্দ থাকে না।
কর্পোরেট বা ইন্ডাস্ট্রি লিংকের অভাব: দেশের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর (যেমন: গার্মেন্টস, ফার্মাসিউটিক্যালস বা আইটি সেক্টর) সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সমন্বিত গবেষণার সংস্কৃতি এখনো শক্তিশালী নয়। ফলে বড় কর্পোরেট ফান্ডিং খুব একটা পাওয়া যায় না।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০১০-এর দুর্বল প্রয়োগ: এই আইনে গবেষণায় বাধ্যতামূলক বরাদ্দের কথা বলা থাকলেও, তদারকির অভাবে অনেক বিশ্ববিদ্যালয় তা বাস্তবায়ন করে না।
ইউজিসির জানিয়েছে, সম্প্রতি দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা খাতের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়াতে ইউজিসি কঠোর অবস্থান নিচ্ছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট থেকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা বরাদ্দ কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওপরও নিয়মিত তদারকি ও গাইডলাইন মানার চাপ তৈরি করা হবে।
ইউজিসি-এর নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক বাজেটের একটি নির্দিষ্ট অংশ ন্যূনতম ১% থেকে ৩% গবেষণার জন্য বাধ্যতামূলকভাবে বরাদ্দ রাখার নির্দেশনা রয়েছে।
প্রতি বছর ইউজিসি তাদের বার্ষিক প্রতিবেদনে কোন বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণায় কত টাকা খরচ করেছে, তার একটি খতিয়ান প্রকাশ করে। যেসব বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণায় একেবারেই খরচ করে না, তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা হবে বলে জানিয়েছে ইউজিসি।