দেশে প্রথম সফল রোবোটিক সার্জারি ইউনাইটেড হেলথকেয়ারের
-
- - নিজস্ব -
- প্রতিবেদক --
- ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো পূর্ণাঙ্গ রোবোটিক সার্জারি সফলভাবে সম্পন্ন করার দাবি করেছে ইউনাইটেড হেলথকেয়ার। রাজধানীর মাদানী অ্যাভিনিউয়ে প্রতিষ্ঠানটির হাসপাতালে ‘মেডবট তুমাই এন্ডোস্কোপিক সার্জিক্যাল রোবট’-এর মাধ্যমে সোমবার (৩১ আগস্ট) একদিনে দুটি অস্ত্রোপচার করা হয়।
এর মধ্যে ৫৭ বছর বয়সী এক পুরুষের পিত্তথলির পাথর অপসারণে রোবোটিক কোলেসিস্টেকটমি এবং ৪৫ বছর বয়সী এক নারীর অস্বাভাবিক জরায়ু রক্তক্ষরণের চিকিৎসায় রোবোটিক হিস্টেরেকটমি করা হয়।
মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) সকালে ইউনাইটেড হেলথকেয়ারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানানো হয়।
প্রথম অস্ত্রোপচারে নেতৃত্ব দেন ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের প্রধান ও প্রধান পরামর্শক অধ্যাপক ডা. রফিকুস সালেহীন। দ্বিতীয় অস্ত্রোপচারটি করেন হাসপাতালের প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিভাগের জ্যেষ্ঠ পরামর্শক ও প্রধান অধ্যাপক ডা. সামছাদ জাহান শেলি।
অধ্যাপক রফিকুস সালেহীন বলেন, ‘এটি একটি মাইলফলক। আমরা এই পরিবর্তনের অংশ হতে পেরেছি।’
তিনি বলেন, রোবোটিক সার্জারিতে ব্যবহৃত রোবটের বাহু ৩৬০ ডিগ্রি পর্যন্ত ঘুরতে পারে। মানুষের হাতের তুলনায় এর নড়াচড়া বেশি হওয়ায় শরীরের সংকীর্ণ ও জটিল জায়গায় তুলনামূলক নিখুঁতভাবে অস্ত্রোপচার করা সম্ভব। এ পদ্ধতিতে গুরুত্বপূর্ণ রক্তনালি ও আশপাশের অঙ্গ নিরাপদ রাখার পাশাপাশি কম কাটাছেঁড়া, কম রক্তক্ষরণ এবং দ্রুত সুস্থ হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। প্রথম অস্ত্রোপচার করা রোগীকে এক থেকে দুই দিনের মধ্যে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়ার কথা জানান তিনি।
তবে রোবোটিক সার্জারি প্রচলিত অস্ত্রোপচারের তুলনায় ব্যয়বহুল বলে জানান অধ্যাপক রফিকুস সালেহীন। তার ভাষ্য, এ পদ্ধতিতে চিকিৎসার খরচ প্রচলিত অস্ত্রোপচারের তুলনায় প্রায় দুই থেকে তিন গুণ বেশি হতে পারে। দেশে রোবোটিক সার্জারির ব্যবহার বাড়লে ভবিষ্যতে এ খরচ কমে আসবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। রোবোটিক সার্জারির নির্ভুলতা ও অন্যান্য সুবিধার কারণে উন্নত চিকিৎসার জন্য অনেক রোগী বিদেশে যান উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশে এ সেবা চালু হওয়ায় তাদের একটি অংশ এখন দেশেই চিকিৎসা নিতে পারবেন।
তিনি বলেন, ইউনাইটেড হেলথকেয়ারে রোবটটি আগে থেকেই আনা হয়েছিল। কয়েকজন চিকিৎসক বিদেশে গিয়ে এর ব্যবহারের ওপর প্রশিক্ষণও নিয়েছেন। রোবোটিক সার্জারির জন্য ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের অনুমোদন পাওয়ার পর আনুষ্ঠানিকভাবে অস্ত্রোপচার শুরু করা হয়। গত বৃহস্পতিবার অনুমোদনের কপি হাতে পাওয়ার পর গতকাল সোমবার দুটি অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করা হয়।
অধ্যাপক ডা. সামছাদ জাহান শেলি বলেন, প্রতিবেশী কয়েকটি দেশে রোবোটিক সার্জারি চালু হলেও বাংলাদেশ এতদিন এ ক্ষেত্রে পিছিয়ে ছিল। এখন দেশে এ ধরনের আধুনিক চিকিৎসা কার্যক্রম শুরু হয়েছে। শিগগির হৃদরোগ, নিউরো, ইউরোলজি, জেনারেল সার্জারি, গাইনি ও থোরাসিক বিভাগেও রোবোটিক সার্জারি সম্প্রসারণ করা হবে। দীর্ঘমেয়াদে দেশে উন্নত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা এবং চিকিৎসার জন্য রোগীদের বিদেশমুখিতা কমানো তাদের অন্যতম লক্ষ্য বলেও জানান তিনি। এতে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হবে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
এর আগে ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে রিমোট রোবোটিক পদ্ধতিতে স্টেন্ট স্থাপনের একটি প্রক্রিয়া করা হয়েছিল। তবে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, সেটি পূর্ণাঙ্গ রোবোটিক সার্জারি ছিল না। ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কার্ডিয়াক সার্জারি বিভাগের জ্যেষ্ঠ পরামর্শক অধ্যাপক ডা. মোফাসসেল উদ্দিন আহমেদ বলেন, জাতীয় হৃদ্রোগ ইনস্টিটিউটে করা প্রক্রিয়া এবং ইউনাইটেড হেলথকেয়ারে সম্পন্ন হওয়া দুটি অস্ত্রোপচার সম্পূর্ণ ভিন্ন।
তিনি বলেন, হৃদ্রোগ হাসপাতালে স্টেন্ট স্থাপনের প্রক্রিয়ার একটি অংশে রোবটের সহায়তা নেওয়া হয়েছিল। অন্যদিকে ইউনাইটেড হেলথকেয়ারে থাকা বিশেষায়িত রোবট সরাসরি অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করেছে। তার ভাষ্য, হৃদ্রোগ ইনস্টিটিউটে রোবটটি প্রদর্শনের জন্য আনা হয়েছিল এবং সেটি দিয়ে ধারাবাহিকভাবে দ্বিতীয় কোনো অস্ত্রোপচার করা হয়নি। এ কারণে ইউনাইটেড হেলথকেয়ারে সম্পন্ন হওয়া অস্ত্রোপচারকে দেশে সফলভাবে সম্পন্ন হওয়া প্রথম পূর্ণাঙ্গ রোবোটিক সার্জারি বলা হচ্ছে।
সংবাদ সম্মেলনে ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চেয়ারম্যান এ. কিউ. এম ডা. মোহসিন বলেন, দেশের অনেক রোগী বিভিন্ন কারণে চিকিৎসার জন্য বিদেশে যান। তবে অনেক ক্ষেত্রেই দেশে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা দেওয়ার সক্ষমতা রয়েছে। রোবোটিক সার্জারিও এমন একটি সেবা, যা দেশে চালু হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশমুখিতা কমানো সম্ভব হবে। ইউনাইটেড হেলথকেয়ার এ ধরনের সেবা সম্প্রসারণে কাজ করছে।
গ্যাস্ট্রোলজিস্ট হিসেবে দেশের গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি ও লিভার চিকিৎসাসেবার অগ্রগতির কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, লিভার ট্রান্সপ্লান্ট ছাড়া গ্যাস্ট্রো ও লিভার রোগের বেশিরভাগ চিকিৎসা ও প্রক্রিয়া এখন দেশেই করা সম্ভব। ইউনাইটেড হেলথকেয়ার ও ন্যাশনাল গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউটের যৌথ উদ্যোগে আগামী কয়েক মাসের মধ্যে নিয়মিতভাবে লিভার ট্রান্সপ্লান্ট করার কার্যক্রম শুরু করার লক্ষ্য রয়েছে।
এ কে এম ডা. মোহসিন বলেন, ‘মেডিকেল সেক্টরে আমরা যেন পরনির্ভরশীল না থাকি, সেই বিষয়টি মাথায় রেখে ইউনাইটেড হেলথকেয়ার এগিয়ে আসছে।