বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে ব্র্যাক ইউনিভার্সিটিতে সেমিনার

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বর্তমান পরিস্থিতি এবং ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে ব্র্যাক ইউনিভার্সিটিতে সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে। মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, বিশ্ববিদ্যালয়ের মেরুল বাড্ডা ক্যাম্পাসে আয়োজিত এই সেমিনারের শিরোনাম ছিল বিদ্যুৎ, জ্বালানি পরিস্থিতি ও উত্তরণের পথ।

সেমিনারটির আয়োজন করেছে ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর এনার্জি অ্যান্ড লজিস্টিকস (সিইএল)। সম্প্রতি সেন্টারটির যাত্রা শুরু হয়েছে। এতে অংশ নেন নীতিনির্ধারক, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এবং শিক্ষাবিদরা। তারা দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ এবং সম্ভাব্য সমাধান নিয়ে আলোচনা করেন।

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন সিইএলের অ্যাডভাইজরি কাউন্সিলের চেয়ারম্যান এবং ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সদস্য ড. সুলতান হাফিজ রহমান। তিনি তার বক্তব্যে ৭০ এর দশকের বৈশ্বিক তেল সংকটের পর থেকে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের পরিবর্তিত বাস্তবতার কথা তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ একটি গুরুতর জ্বালানি সংকটের মুখোমুখি হয়েছে কারণ আমরা আমাদের নিজস্ব সক্ষমতাকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারিনি। একই সাথে আমরা  ভেতরের সমস্যার সমাধান করতে বারবার বাইরের সহায়তার ওপর নির্ভর করেছি।

তিনি আরও বলেন, সিইএল এর দায়িত্ব হবে সমস্যা চিহ্নিত করা এবং সেই সাথে সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের এক সঙ্গে নিয়ে শিক্ষা, গবেষণা এবং নীতিগত পরামর্শের মাধ্যমে কার্যকর সমাধান তৈরিতে ভূমিকা রাখা।

সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের বাংলাদেশবিষয়ক প্রধান জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলম। তিনি বলেন, আমদানিনির্ভর ও ডলারে মূল্য নির্ধারিত জীবাশ্ম জ্বালানি বর্তমানে দেশের জ্বালানি খাতের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ।

তিনি জানান, দেশে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ১৯ হাজার ২৭ মেগাওয়াটে পৌঁছেছে। সেই সাথে তিনি গ্যাস সরবরাহে অনিশ্চয়তা, আমদানিনির্ভরতা এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির ঝুঁকির বিষয়গুলো তুলে ধরেন। তিনি নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ এবং জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধির সম্ভাবনা ও গুরুত্ব তুলে ধরেন।

দ্বিতীয় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন কনটেইনার কোম্পানি অব বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহামেদুল করিম চৌধুরী। তিনি জ্বালানি নিরাপত্তাকে একটি লজিস্টিকস চ্যালেঞ্জ হিসেবে তুলে ধরেন এবং উৎপাদক থেকে ভোক্তার কাছে জ্বালানি পৌঁছে দেওয়ার পুরো ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা করেন।

তিনি এলএনজি ও পেট্রোলিয়াম সরবরাহ ব্যবস্থার বিভিন্ন দিক এবং এ খাতের অবকাঠামোগত প্রস্তুতি নিয়ে আলোচনা করেন। পাশাপাশি তিনি জ্বালানি খাতের সক্ষমতা নিশ্চিতে বৈচিত্র্য, বিকল্প ব্যবস্থা, মজুত সক্ষমতা, সংযোগ, তথ্যপ্রবাহ এবং সমন্বয়ের গুরুত্ব তুলে ধরেন।

পরে ছয়জন আলোচকের অংশগ্রহণে একটি প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রফেসর এবং সিইএলের অ্যাডভাইজরি কাউন্সিলের সদস্য প্রফেসর ড. আব্দুল হাসিব চৌধুরী বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেন।

এমজেএল বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ইস্ট কোস্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান এবং সিইএলের অ্যাডভাইজরি কাউন্সিলের সদস্য আজম জে চৌধুরী বর্তমান সংকট মোকাবেলা এবং সংশ্লিষ্ট খাতগুলোর দ্রুত সংস্কার বিষয়ে কথা বলেন।

এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এডিবি) সিনিয়র এনার্জি অ্যাডভাইজর সিদ্দিক জোবায়ের বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের উন্নয়ন, গ্যাস অনুসন্ধান এবং কয়লাভিত্তিক জ্বালানি উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা করেন।

ওফানিক্স অ্যানালিটিকসের অ্যাক্টিং চিফ টেকনোলজি অফিসার এবং সিইএল ফেলো ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব অনলাইনে যুক্ত হয়ে দেশের বিদ্যুৎ ঘাটতি এবং সমন্বিত জ্বালানি পরিকল্পনার অভাব নিয়ে বক্তব্য দেন।

ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর এনার্জি রিসার্চের ডিরেক্টর শাহরিয়ার আহমেদ চৌধুরী নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা করেন।

ব্র্যাক বিজনেস স্কুলের প্রফেসর এবং সিইএল ফেলো ড. সেবাস্টিয়ান গ্রোহ দেশের প্রায় ৬০ লাখ বৈদ্যুতিক তিন চাকার যানবাহনকে কীভাবে সম্ভাবনাময় বিদ্যুৎ সম্পদ হিসেবে গড় তোলা যায় সে বিষয়ে বক্তব্য দেন।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন। তিনি মাতারবাড়ীতে স্থলভিত্তিক রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট স্থাপন এবং সমুদ্রের গ্যাস ব্লকে অনুসন্ধান কার্যক্রমসহ সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রম নিয়ে কথা বলেন।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির প্রো-ভাইস-চ্যান্সেলর প্রফেসর আরশাদ মাহমুদ চৌধুরী ও সিইএলের ডিরেক্টর ড. মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান।

অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর এবং সাবেক উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ, সাবেক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির ট্রেজারার আরিফুল ইসলাম এবং ব্র্যাক বিজনেস স্কুলের ডিন প্রফেস ড. মোহাম্মদ মুজিবুল হক।

এই সেমিনার জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির অঙ্গীকারকে আরও এগিয়ে নিয়েছে। বিশেষ করে এসডিজি-৭ (সাশ্রয়ী ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানি) এবং এসডিজি-৯ (শিল্প, উদ্ভাবন ও অবকাঠামো) অর্জনের সঙ্গে এই উদ্যোগ সরাসরি সম্পৃক্ত।

পাঠকের মন্তব্য