কিউআর কোডের আড়ালে মাদকের ফাঁদ: সিক্রেট গ্রুপে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা!
-
- - নিজস্ব -
- প্রতিবেদক --
- ২৩ অক্টোবর, ২০২৬
ভিজিটিং কার্ড বিলি করে ক্রেতা সংগ্রহ। তারপর মাদক বিক্রি। কার্ডের কিউআর কোড স্ক্যান করলে নিয়ে যাচ্ছে সিক্রেট টেলিগ্রাম গ্রুপে। গ্রুপে অর্ডার করলে হোম ডেলিভারিতে মিলছে মাদক কুশ ও সিনথেটিক গাঁজা। অভিনব কায়দার মাদক ব্যবসার অভিযোগে সম্প্রতি ধরা পড়েছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ড্রপআউট শিক্ষার্থী।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর (ডিএনসি) বলছে, সিক্রেট গ্রুপ থেকে মাদক কিনছে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় চারশ শিক্ষার্থী।
আসা ভিজিটিং কার্ডে দেখা যায়, কার্ডের একপাশে লেখা ‘ক্রেভিংস’। অন্যপাশে একটি সাধারণ কিউআর কোড। আপাতদৃষ্টিতে কোনো রেস্তোরাঁ বা ব্র্যান্ডের প্রচারণাপত্র মনে হলেও, এই কোডের আড়ালেই লুকিয়ে ছিল এক ভয়ংর মাদকের জগৎ। এই কিউআর কোড স্ক্যান করলেই ব্যবহারকারী পৌঁছে যেতেন একটি গোপন ওয়েবসাইটে, যেখানে রয়েছে একটি সিক্রেট টেলিগ্রাম গ্রুপের লিংক। সেখানে লগইন ও রেজিস্ট্রেশন করে সাবস্ক্রাইব করলেই সরাসরি যোগাযোগ করা যেত গ্রুপ অ্যাডমিনের সঙ্গে। আর অর্ডার করলেই মিলত ‘কুশ’ ও ‘সিনথেটিক গাঁজা’র মতো উচ্চমাত্রার মাদক, যা পৌঁছে দেয়া হতো সরাসরি হোম ডেলিভারির মাধ্যমে।
ডিজিটাল প্রযুক্তির এমন অভিনব অপব্যবহার করে রাজধানীর নামি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের টার্গেট করে গড়ে উঠেছিল এই ভয়ংকর মাদক চক্র।
সম্প্রতি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের (ডিএনসি) সাইবার প্যাট্রলিং ও বিশেষ অভিযানে উন্মোচিত হয়েছে মাদক কেনাবেচার এই আধুনিক নেটওয়ার্ক। রাজধানীর ভাটারা এলাকায় অভিযান চালিয়ে এই চক্রের মূল হোতা ও গ্রুপ অ্যাডমিন সাইম ইসলামকে গ্রেফতার করেছে ডিএনসি। এ সময় তার কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে প্রায় আধা কেজি কুশ, সিনথেটিক গাঁজা, বিপুল পরিমাণ বিশেষ ভিজিটিং কার্ড এবং মাদক বিক্রির নানা আলামত।
আইটি জ্ঞান খাটিয়ে ড্রপআউট শিক্ষার্থীর মাদক সাম্রাজ্য
সাইমকে জিজ্ঞাসাবাদে সামনে আসে পুরো চিত্র। গ্রেফতার সাইম ২০২৪ সালে ভর্তি হন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্সে। দুই বছর পর ড্রপআউট। পড়াশোনা ছেড়ে দিলেও নিজের আইটি জ্ঞানকে তিনি কাজে লাগান মাদক ব্যবসার প্রসারে। প্রযুক্তির আড়ালে নিজেকে সম্পূর্ণ আড়াল করে ‘ক্রেভিংস’ নামে একটি সিক্রেট টেলিগ্রাম গ্রুপ পরিচালনা করছিলেন সাইম।
টার্গেট বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার ৪০০ শিক্ষার্থী
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর (ডিএনসি) জানিয়েছে, সাইমের তৈরি ওই গোপন টেলিগ্রাম গ্রুপে ৩৯৭ জন সাবস্ক্রাইবার রয়েছে, যাদের প্রায় সবাই বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। কৌশলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মাঝে বিশেষ কিউআর কোড সংবলিত ভিজিটিং কার্ড বিলি করে এই বিশাল গ্রাহকশ্রেণি গড়ে তোলেন সাইম। গ্রুপে অর্ডারের পর অত্যন্ত গোপনে শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছে দেয়া হতো সিনথেটিক গাঁজা ও কুশ।
নেপথ্যে আন্তর্জাতিক চক্রের হাত?
ডিএনসি কর্মকর্তারা জানান, গাঁজার চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ শক্তিশালী ও মারাত্মক ক্ষতিকর এই ‘কুশ’ মাদকটির বাজার বাংলাদেশে ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে একটি আন্তর্জাতিক মাদক চক্র। সম্প্রতি ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কুশের বেশ কয়েকটি বড় চালান ধরা পড়েছে। গ্রেফতার সাইম সরাসরি সেই আন্তর্জাতিক চক্রের কাছ থেকে মাদক সংগ্রহ করছিল কি না, তা খতিয়ে দেখছে ডিএনসি।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের ঢাকা বিভাগীয় গোয়েন্দা কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. মেহেদী হাসান বলেন, গত ছয় মাস ধরে মাদকের কেনাবেচা করছিল এই গ্রুপের মাধ্যমে। তাদের টার্গেট ছিল বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বা উঠতি বয়সি ছেলে-মেয়েরা। তাদেরকে কার্ডের মাধ্যমে টেলিগ্রাম গ্রুপে নিয়ে যাওয়া হতো। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ফাঁকি দিতে তারা একটা নিরাপদ চ্যানেল তৈরি করেছিল।
তিনি বলেন, টেলিগ্রাম গ্রুপের সদস্যরা বিভিন্ন সময়ে সাইমের মাধ্যমে মাদক কেনাবেচা করত। আমরা এরই মধ্যে তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ দিয়েছি। এর সঙ্গে আরও কেউ জড়িত আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
দেশে এই উচ্চমাত্রার মাদকের বিস্তার ও বাজার তৈরির যে কোনো প্রচেষ্টা নসাৎ করতে এরইমধ্যেই গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর।